শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

শব্দদূষণ কী?

গাড়ির হর্ন, নির্মাণ কাজ, শিল্প-কারখানা, গ্রিল তৈরি, টাইলস কাটা, মেশিনে ইট ভাঙা, মাইক বাজানো, জেনারেটরের শব্দে কান ঝালাপালার শহর ঢাকা শহর। যত্রতত্র এসব থেকেই ছড়ায় শব্দদূষণ। আসুন জেনে নেই শব্দদূষণ আসলে কী? শব্দদূষণ বলতে শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। মানুষ সাধারণত ২০-২০,০০০ হার্জের কম বা বেশি শব্দ শুনতে পায় না। তাই মানুষের জন্য শব্দদূষণ প্রকৃতপক্ষে এই সীমার মধ্যেই তীব্রতর শব্দ দ্বারাই হয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন অপ্রয়োজনীয় শব্দ মানুষের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে বিরক্তি ঘটিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতিসাধন করে সেটাই শব্দ দূষণ। অর্থাৎ মানুষের শ্রবণ সক্ষমতার অতিরিক্ত, তীব্র, তীক্ষ্ম, অবাঞ্ছিত, কর্কশ বা অস্বস্তিকর শব্দ যা মানুষের শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেয়। যে শব্দ শরীর ও মনের উপর নানাবিধ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তাকে শব্দ দূষণ বলে বিবেচনা করা হয়। শব্দদূষণ ঘটছে মূলত যানবাহনে ব্যবহৃত হাইড্রোলিক ভেঁপু, মাইক্রোফোন, শ্রুতিবাদন যন্ত্র, কলকারখানার শব্দ এবং নির্মাণ কাজের শব্দ দ্বারা।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ আইনে কি আছে?

পরিবেশ রক্ষা আইন-১৯৯৫ এর ২০ ধারায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা মোতাবেক এলাকাভেদে শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ মালা- ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়।  শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ এর ৭ বিধি অনুসারে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। উক্ত আইনের তফসিল ১ এ এলাকাভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। উক্ত আইনের বিধি ৮ এ হর্ন ব্যবহারে বিধি-নিষেধের বিধান রয়েছে। এই বিধিতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি মোটর, নৌ বা অন্য কোন যানে অনুমোদিত শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন ব্যবহার করতে পারবেন না। আরও বলা হয়েছে, নীরব এলাকায় চলাচলকালে যানবাহনে কোন প্রকার হর্ন বাজানো যাবে না। এই আইনের ৯ বিধি অনুসারে কতিপয় ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন; বিবাহ বা অন্য কোন সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট ইত্যাদি।

১১ বিধিতে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে উক্ত এলাকায় নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ইট বা পাথর ভাঙ্গার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। উক্ত আইনে শব্দদূষণ সংক্রান্তে তথ্য প্রদানের বিধানও রয়েছে। এই আইনের ১৫ বিধিতে বলা হয়েছে, বিধি ৯ এর অধীন অনুমতি ব্যতীত কোন এলাকায় শব্দ দূষণ সংক্রান্ত বিধান লংঘনকারী ব্যক্তিকে মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারবেন এবং উক্তরূপ নির্দেশ পালনে যন্ত্রপাতি ব্যবহারকারী বা বিধান লংঘনকারী বাধ্য থাকবেন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। বিধি অনুযায়ী আরও বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবলের মধ্যে রাখতে হবে। নীরব এলাকায় (হাসপাতাল ও স্কুল সংলগ্ন এলাকা) দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। মিশ্র এলাকায় (আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা) দিনে ৬০ ডেসিবেল এবং রাতে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপ্তরিক কাজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠান, বিমান, রেলগাড়ি, এম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেডের যান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপদ সংকেতের প্রচারের ক্ষেত্রে এই বিধিমালা প্রযোজ্য নয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬ এর ৯ ধারা অনুসারে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নীরব এলাকার বাইরে কোনো খোলা বা আংশিক খোলা জায়গায় সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রিয়া, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সভা বা অনুষ্ঠানে শব্দের মান মাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ আইনের ১৮ বিধি অনুসারে, উপরে উল্লেখিত বিধিসমূহ লংঘনের ক্ষেত্রে অপরাধী প্রথম অপরাধের জন্য ১ মাস কারাদণ্ডে বা ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ৬ মাস বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বাংলাদেশে শব্দদূষণ রোধে ২০০৬ সালে প্রণীত ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা’ অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে শব্দের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধিমালায় দিন ও রাতকে বিবেচনা করে আবাসিক এলাকা, নীরব এলাকা, মিশ্র এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে, আইন থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে শব্দদূষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নির্ধারিত এলাকার শব্দ সীমা-

  • নীরব এলাকা: দিন ৫০ ডেসিবেল, রাত ৪০ ডেসিবেল।
  • আবাসিক এলাকা: দিন ৫৫ ডেসিবেল, রাত ৪৫ ডেসিবেল।
  • বাণিজ্যিক এলাকা: দিন ৭০ ডেসিবেল, রাত ৬০ ডেসিবেল।
  • শিল্প এলাকা: দিন ৭৫ ডেসিবেল, রাত ৭০ ডেসিবেল।

দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং রাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবতা হল নগর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন এই সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

শব্দদূষণের কারণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

মানুষের কান স্বাভাবিক শব্দ শোনার জন্য যথেষ্ট সংবেদনশীল। অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত শব্দ যেকোনো মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শব্দদূষণের প্রধান উৎস যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, শিল্পাঞ্চলের কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের অপব্যবহার। এছাড়া বিবাহ, মেলা, পার্টিতে ব্যবহৃত লাউড স্পিকার, আতশবাজি ফুটানো শব্দদূষণ সৃষ্টি করে থাকে।  অতিরিক্ত শব্দের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মানসিক চাপ, বধিরতা, এমনকি শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শব্দের মাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বৃদ্ধিতে যেকোনো বয়সের মানুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৪ ভাগ করে বৃদ্ধি পায়। তবে তা ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে ২৭ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূষণ ও পরিবেশগত মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়, যেখানে বিশ্বব্যাপী এই হার ১৬ শতাংশ।

শব্দ দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য এবং আচরণগত জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। অস্বাভাবিক শব্দ মানুষের চিন্তা ও কাজ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে মানুষ। উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, মানসিক অশান্তিতে ভুগছে, ক্লান্ত ও অমনোযোগী করে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, স্নায়ুর সমস্যা, আলসার, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, আত্মহত্যার প্রবণতা, হৃদরোগের মতো জটিল রোগের কারণ হতে পারে উচ্চমাত্রার শব্দ। এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা শিশুরও জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি তিন বছরের কম বয়স্ক শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ১০০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ শোনে, তাহলে সে তার শ্রবণক্ষমতা হারাতে পারে। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য উপাদানগুলো হল; বেতার, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার ও মাইক্রোফোনের উচ্চ শব্দ, কলকারখানার শব্দ এবং উচ্চমাত্রার চিৎকার, হৈচৈ ও গোলমাল ইত্যাদি।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

আইন বাস্তবায়নে করণীয়

আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ;

  • কঠোর নজরদারি ও জরিমানা: শব্দের সীমা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।
  • প্রযুক্তির ব্যবহার: হর্ন নিয়ন্ত্রণ ও শব্দ পর্যবেক্ষণ ডিভাইস স্থাপন।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রচার।
  • স্থানীয় উদ্যোগ: এলাকাভিত্তিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন।
  • পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি: নির্মাণকাজে কম শব্দ তৈরি হয় এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার।

এমনকি বাড়িতেও সাউন্ডপ্রুফিং উপকরণগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে ডবল-পেন উইন্ডো শব্দদূষণ প্রতিরোধে দারুণ কার্যকরী। শব্দ কমানোর একটি সহজ উপায় হল, চারপাশে ফাঁকা জায়গায় প্রচুর গাছ লাগানো। এক্ষেত্রে শব্দদূষণ কমবে এবং সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে আপনার শারীরিক ক্ষতিও কমাবে। শব্দদূষণ রোধে আইন প্রয়োগ এবং জনগণের অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ও যত্রতত্র সবধরনের হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। সচেতনতা, শক্তিশালী নীতি, এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে শব্দদূষণমুক্ত একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গলের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান পরিবেশ অধিদপ্তরের

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপডেট সময় ০৩:২৯:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৪

শব্দদূষণ কী?

গাড়ির হর্ন, নির্মাণ কাজ, শিল্প-কারখানা, গ্রিল তৈরি, টাইলস কাটা, মেশিনে ইট ভাঙা, মাইক বাজানো, জেনারেটরের শব্দে কান ঝালাপালার শহর ঢাকা শহর। যত্রতত্র এসব থেকেই ছড়ায় শব্দদূষণ। আসুন জেনে নেই শব্দদূষণ আসলে কী? শব্দদূষণ বলতে শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। মানুষ সাধারণত ২০-২০,০০০ হার্জের কম বা বেশি শব্দ শুনতে পায় না। তাই মানুষের জন্য শব্দদূষণ প্রকৃতপক্ষে এই সীমার মধ্যেই তীব্রতর শব্দ দ্বারাই হয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন অপ্রয়োজনীয় শব্দ মানুষের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে বিরক্তি ঘটিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতিসাধন করে সেটাই শব্দ দূষণ। অর্থাৎ মানুষের শ্রবণ সক্ষমতার অতিরিক্ত, তীব্র, তীক্ষ্ম, অবাঞ্ছিত, কর্কশ বা অস্বস্তিকর শব্দ যা মানুষের শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেয়। যে শব্দ শরীর ও মনের উপর নানাবিধ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তাকে শব্দ দূষণ বলে বিবেচনা করা হয়। শব্দদূষণ ঘটছে মূলত যানবাহনে ব্যবহৃত হাইড্রোলিক ভেঁপু, মাইক্রোফোন, শ্রুতিবাদন যন্ত্র, কলকারখানার শব্দ এবং নির্মাণ কাজের শব্দ দ্বারা।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ আইনে কি আছে?

পরিবেশ রক্ষা আইন-১৯৯৫ এর ২০ ধারায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা মোতাবেক এলাকাভেদে শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ মালা- ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়।  শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ এর ৭ বিধি অনুসারে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। উক্ত আইনের তফসিল ১ এ এলাকাভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। উক্ত আইনের বিধি ৮ এ হর্ন ব্যবহারে বিধি-নিষেধের বিধান রয়েছে। এই বিধিতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি মোটর, নৌ বা অন্য কোন যানে অনুমোদিত শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন ব্যবহার করতে পারবেন না। আরও বলা হয়েছে, নীরব এলাকায় চলাচলকালে যানবাহনে কোন প্রকার হর্ন বাজানো যাবে না। এই আইনের ৯ বিধি অনুসারে কতিপয় ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন; বিবাহ বা অন্য কোন সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট ইত্যাদি।

১১ বিধিতে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে উক্ত এলাকায় নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ইট বা পাথর ভাঙ্গার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। উক্ত আইনে শব্দদূষণ সংক্রান্তে তথ্য প্রদানের বিধানও রয়েছে। এই আইনের ১৫ বিধিতে বলা হয়েছে, বিধি ৯ এর অধীন অনুমতি ব্যতীত কোন এলাকায় শব্দ দূষণ সংক্রান্ত বিধান লংঘনকারী ব্যক্তিকে মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারবেন এবং উক্তরূপ নির্দেশ পালনে যন্ত্রপাতি ব্যবহারকারী বা বিধান লংঘনকারী বাধ্য থাকবেন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। বিধি অনুযায়ী আরও বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবলের মধ্যে রাখতে হবে। নীরব এলাকায় (হাসপাতাল ও স্কুল সংলগ্ন এলাকা) দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। মিশ্র এলাকায় (আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা) দিনে ৬০ ডেসিবেল এবং রাতে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপ্তরিক কাজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠান, বিমান, রেলগাড়ি, এম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেডের যান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপদ সংকেতের প্রচারের ক্ষেত্রে এই বিধিমালা প্রযোজ্য নয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৬ এর ৯ ধারা অনুসারে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নীরব এলাকার বাইরে কোনো খোলা বা আংশিক খোলা জায়গায় সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রিয়া, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সভা বা অনুষ্ঠানে শব্দের মান মাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে।

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ আইনের ১৮ বিধি অনুসারে, উপরে উল্লেখিত বিধিসমূহ লংঘনের ক্ষেত্রে অপরাধী প্রথম অপরাধের জন্য ১ মাস কারাদণ্ডে বা ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ৬ মাস বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বাংলাদেশে শব্দদূষণ রোধে ২০০৬ সালে প্রণীত ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা’ অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে শব্দের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধিমালায় দিন ও রাতকে বিবেচনা করে আবাসিক এলাকা, নীরব এলাকা, মিশ্র এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে, আইন থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে শব্দদূষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নির্ধারিত এলাকার শব্দ সীমা-

  • নীরব এলাকা: দিন ৫০ ডেসিবেল, রাত ৪০ ডেসিবেল।
  • আবাসিক এলাকা: দিন ৫৫ ডেসিবেল, রাত ৪৫ ডেসিবেল।
  • বাণিজ্যিক এলাকা: দিন ৭০ ডেসিবেল, রাত ৬০ ডেসিবেল।
  • শিল্প এলাকা: দিন ৭৫ ডেসিবেল, রাত ৭০ ডেসিবেল।

দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং রাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবতা হল নগর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন এই সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

শব্দদূষণের কারণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

মানুষের কান স্বাভাবিক শব্দ শোনার জন্য যথেষ্ট সংবেদনশীল। অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত শব্দ যেকোনো মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শব্দদূষণের প্রধান উৎস যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, শিল্পাঞ্চলের কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের অপব্যবহার। এছাড়া বিবাহ, মেলা, পার্টিতে ব্যবহৃত লাউড স্পিকার, আতশবাজি ফুটানো শব্দদূষণ সৃষ্টি করে থাকে।  অতিরিক্ত শব্দের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মানসিক চাপ, বধিরতা, এমনকি শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শব্দের মাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বৃদ্ধিতে যেকোনো বয়সের মানুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৪ ভাগ করে বৃদ্ধি পায়। তবে তা ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে ২৭ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূষণ ও পরিবেশগত মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়, যেখানে বিশ্বব্যাপী এই হার ১৬ শতাংশ।

শব্দ দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য এবং আচরণগত জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। অস্বাভাবিক শব্দ মানুষের চিন্তা ও কাজ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে মানুষ। উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, মানসিক অশান্তিতে ভুগছে, ক্লান্ত ও অমনোযোগী করে তুলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, স্নায়ুর সমস্যা, আলসার, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, আত্মহত্যার প্রবণতা, হৃদরোগের মতো জটিল রোগের কারণ হতে পারে উচ্চমাত্রার শব্দ। এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা শিশুরও জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি তিন বছরের কম বয়স্ক শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ১০০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ শোনে, তাহলে সে তার শ্রবণক্ষমতা হারাতে পারে। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য উপাদানগুলো হল; বেতার, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার ও মাইক্রোফোনের উচ্চ শব্দ, কলকারখানার শব্দ এবং উচ্চমাত্রার চিৎকার, হৈচৈ ও গোলমাল ইত্যাদি।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি prokritibarta

আইন বাস্তবায়নে করণীয়

আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ;

  • কঠোর নজরদারি ও জরিমানা: শব্দের সীমা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।
  • প্রযুক্তির ব্যবহার: হর্ন নিয়ন্ত্রণ ও শব্দ পর্যবেক্ষণ ডিভাইস স্থাপন।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রচার।
  • স্থানীয় উদ্যোগ: এলাকাভিত্তিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন।
  • পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি: নির্মাণকাজে কম শব্দ তৈরি হয় এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার।

এমনকি বাড়িতেও সাউন্ডপ্রুফিং উপকরণগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে ডবল-পেন উইন্ডো শব্দদূষণ প্রতিরোধে দারুণ কার্যকরী। শব্দ কমানোর একটি সহজ উপায় হল, চারপাশে ফাঁকা জায়গায় প্রচুর গাছ লাগানো। এক্ষেত্রে শব্দদূষণ কমবে এবং সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে আপনার শারীরিক ক্ষতিও কমাবে। শব্দদূষণ রোধে আইন প্রয়োগ এবং জনগণের অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ও যত্রতত্র সবধরনের হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। সচেতনতা, শক্তিশালী নীতি, এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে শব্দদূষণমুক্ত একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গলের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।