আপনার হার্টের যত্ন নেওয়া মানে স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য যত্ন। দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসগুলো অন্তর্ভুক্ত হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। একজন সুস্থ মানুষের হার্ট প্রতি মিনিটে ৫-৬ লিটার রক্ত সারা শরীরে পাম্প করে থাকে। আর এ রক্ত হার্টের প্রসারণের ফলে ধমনির মাধ্যমে শরীরের সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম কোষের অভ্যন্তরে পৌঁছায়। এভাবেই রক্তের মাধ্যমে তার ভেতরে থাকা অক্সিজেন শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, আর তাতেই আমরা উজ্জীবিত হই। এই উজ্জীবিত হওয়ার জন্য সহজে সহজ কিছু উপায় হতে পারে।
প্রথমত, খেলার ছলে ব্যায়াম হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে বড় কাজে দেয়। যেমন হেঁটে কিংবা ফুটবল খেলে সপ্তাহে ন্যূনতম পাঁচ দিন করে রোজ ৩০ মিনিট ব্যয় করা। এরপর খাদ্যাভ্যাস পাল্টানো। ওজনকে হার মানান। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর শ্লোগান হৃদয়ে ধারণ করা। সবসময় পারিপার্শ্বিক অবস্থানে নিজের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ও চাপ কমান অভ্যাস গড়ে তোলা। এগুলো পালন করলে আপনাকে হার্ট নিয়ে বেশ ভাবতে হবে না। তবু কিছু ভাবনা অনেকের মাঝে থেকে যায়।
হার্ট নিয়ে ভাবনা কেন
হার্ট বিরামহীনভাবে চলে। তবে কোনো একসময় ছন্দপতনও হয়। অসচেতনতা, অবহেলায় আমাদের রক্তনালিতে ধীরে ধীরে চর্বি জমে। বার্ধক্যে উপনীত হলে ধমনি গাত্র ভরে ওঠে ক্যালসিয়াম আর রক্তকণিকার জমাট উপাদানে। হার্টের রক্তনালি মাংসপেশিতে নিরবচ্ছিন্ন রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে ন অক্সিজেন জোগাত।কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অক্সিজেনের অভাবে পেশিগুলো ক্রমে অকেজো হয়ে পড়ে। হার্টের মাংসপেশিগুলো নিস্তেজ হওয়ার আগেই অক্সিজেনের অভাবে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। এ অবস্থাটিকে আমরা হার্টের এনজিনার ব্যথা বলে থাকি। এ ধরনের ব্যথা হলো মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাকের পূর্ব সংকেত।
ইতিবাচক মনোভাব ও চাপ কমান
হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে মানসিক প্রশান্তির বিকল্প নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্র কিংবা পরিবার থেকে মানুষ নানাভাবে চাপে থাকে। এসব চাপ যেমন মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি বুদ্ধি করে কমাতেও হবে। প্রতিদিনের কাজের চাপ শেষে নিজের জন্য আলাদা করে একটু সময় বের করুন। পছন্দের গান শুনতে পারেন কিংবা বই পড়তে পারেন। কোনো কারণে মনে কষ্ট পেলে তা বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করে নিন। মনে কষ্ট পুষে রাখবেন না। এ ধরনের অভ্যাস হৃদ্রোগ ডেকে আনে। সবচেয়ে ভালো হয় পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রে কলিগদের সাথে চমৎকার সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলা।
হৃদরোগের কারণ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬৫ বা তার ঊর্ধ্বের বয়সে করোনারি হৃদরোগের কারণে মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। তবে সচেতন না হলে ছেলেরা ৪৫ বছর আর নারীরা ৫৫ বছর বয়স থেকেই এ ধরনের মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে থাকে। শুধু রক্তনালির জমাটবদ্ধতা নয়, উচ্চ রক্তচাপের কারণেও আমরা আমাদের হার্টকে দুর্বল করে ফেলতে পারি। হার্টের অসুখ যে কারণে দেখা যায়; দুশ্চিন্তা, ধূমপান, মদ্যপান, অলস্য জীবনযাপন, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ ও পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস। বিরল ক্ষেত্রে জিনগত কারণে হৃদপেশি দুর্বল হয়ে পড়ায় হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।
রোগের লক্ষণ
রক্ত জমাটবদ্ধতাজনিত এনজিনার কারণে যে বুকের ব্যথা হয়, তার একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যথা সাধারণত বুকের মাঝখানে হাড়ের পেছনে অনুভূত হয়। শরীর ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠে। ব্যথা অনেক ক্ষেত্রে বাম হাতের ভেতর দিক বরাবর নেমে আসতে পারে। হাঁটাহাঁটি করলে বিশেষ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠলে এ ব্যথা আরও তীব্রতর হয়। যারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাদের কোনো এক পর্যায়ে বুকে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। হার্টের অসুখ জটিল আকার ধারণ করলে সে ক্ষেত্রে হার্ট ফেইলিউর হয়ে হাত-পা ও পেটে পানি আসতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ শুধু হার্টের ক্ষতি করে তা নয়, রক্তচাপের জটিলতার কারণে ব্রেইন স্ট্রোক এমনকি কিডনি ফেইলিউর হতে পারে।
মূলত খাদ্যাভ্যাস পাল্টানো একটা যুদ্ধ
অনেকে প্রাণীজ উৎস থেকে প্রাপ্ত ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ (ক্ষতিসাধক স্নেহ পদার্থ) খেতে ভালোবাসেন। যেমন ধরুন, ‘রেড মিট’ কিংবা পূর্ণমাত্রায় ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি। হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে এসব খাবার ছাড়তে হবে। কিন্তু ছাড়বেন কীভাবে? আপনি তো বদভ্যাসের দাস! ভাববেন না, উপায় আছে। অভ্যাসটা ধীরে ধীরে পাল্টান। ‘রেড মিড’-এর মেন্যুতে ধীরে ধীরে ‘লো-ফ্যাট মিট’ যোগ করুন। দুগ্ধজাত খাবারের পরিবর্তে জলপাই কিংবা ‘ক্যানোলা অয়েল’ খেতে পারেন। খাবারে লবণের পরিমাণ কমান। প্রক্রিয়াজাত কিংবা প্যাকেটজাত খাবার কম খান। ভালো করে রান্না করলে শাকসবজি খেতেও কিন্তু দারুণ লাগে। শস্যদানা বা ‘গ্রেইন’যুক্ত খাবার খেতে পারেন, যেমন বাদামি চাল, বার্লি, পপকর্ন, ওটমিল, গমের রুটি, গমের প্যানকেক ইত্যাদি।
হার্ট সুস্থ রাখবেন যেভাবে
বাড়তি লবণ খাবেন না। প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। মাদক ও তামাকজাতীয় দ্রব্য পরিহার করুন। হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে অল্প বয়স থেকেই স্ক্রিনিং করান। উচ্চ রক্তচাপ বা করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ফুসফুসের রোগ থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা অব্যাহত রাখুন।
মনে রাখবেন, ছোট ছোট পরিবর্তনই হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে। আপনার খাদ্য বা ব্যায়ামের রুটিনে কোনো কঠোর পরিবর্তন করার আগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করুন। সুন্দর জীবনের জন্য সুস্থতা প্রয়োজন। আর সুস্থতার জন্য সুস্থ হার্টের বিকল্প নেই।উপরের এই অভ্যাসগুলি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করলে স্বাস্থ্যকর হৃদপিণ্ড উন্নতমানের জীবনযাপনের দিকে আপনাকে পরিচালিত করবে।
ডেস্ক রিপোর্ট 










