ঢাকাসহ সারাদেশে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে। এসময় দেশীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত কয়েক দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশের নানা জায়গায় ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনার খবর দিলেও বাস্তবে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি আবহাওয়া অধিদপ্তর যে পূর্বাভাস দেয় তার পুরোপুরি উল্টোটাও দেখা যায় দেশে। অর্থাৎ বৃষ্টি হবে বললে রোদ উঠে যাচ্ছে, আবার আকাশ পরিষ্কার থাকবে বললে নামছে বৃষ্টি। একারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস নিয়ে রীতিমতো হাসিতামাশা চলে সচেতন নাগরিকদের মধ্যে, ফেসবুকে ট্রল হয়।
কেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রায়ই মেলে না, এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে স্বেচ্ছাচারী আবহাওয়ার মধ্যেই। অন্তত এমনটাই মনে হবে বিস্তারিত কারণগুলো জানলে।
আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে অস্থিতিশীল আবহাওয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। আশপাশের ভারত ও মিয়ানমারের কিছু অঞ্চলের জন্যও এ কথা সত্যি। একই অবস্থা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেরও। যেসব জায়গায় সমুদ্র এসে মেলে স্থলের সঙ্গে, সেখানেই তৈরি হয় এই আনপ্রেডিক্টেবল ব্যাপার, অর্থাৎ অনুমান করে সঠিক পূর্বাভাস দেয়া খুবই কঠিন।
আবহাওয়ার এই অনির্ধারণযোগ্য স্বভাবের কারণে খোদ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই আসলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে গিয়ে অতোটা নিশ্চিত হতে পারেন না। তাদের ভাষ্যমতে, ‘ধরুন, রাজশাহী থেকে একটি ট্রেন আসবে ঢাকায়। বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে ট্রেনটি যে মোটামুটি ছয় ঘণ্টা পরে কমলাপুরে পৌঁছে যাবে, তা বলে দেওয়া যায়। কারণ, রেললাইন একটা নির্দিষ্ট পথ। এই পথ ধরে ট্রেনটি আসবে। কিছুক্ষণ আগে হোক বা পরে, ট্রেনটি পৌঁছাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যেই।
কিন্তু রাজধানীর ফার্মগেটের মোড়ে দাঁড়িয়ে আপনি যদি প্রতিটি গাড়ির গন্তব্য আন্দাজ করার চেষ্টা করেন, কতক্ষণ পরে সেই গাড়িগুলো নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাবে, তা বের করতে চান, পারবেন? যেসব বাসের গন্তব্য নির্দিষ্ট, সেগুলোর বিষয়ে তা–ও খানিকটা আন্দাজ করা সম্ভব। কিন্তু এত এত ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ইত্যাদি গাড়ি? এদের গন্তব্য আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব।
জল-স্থলের সংযোগস্থলে ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সমুদ্র থেকে তৈরি হচ্ছে লঘুচাপ, গড়ে উঠছে মেঘ কিন্তু এদের গন্তব্য আগে থেকে নিখুঁতভাবে হিসাব করাটা বেশ কঠিন। বিশেষ করে লঘুচাপ বেশি সমস্যা করে। দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে, অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বটে কিন্তু শতভাগ নিশ্চিতভাবে এই বিষয়গুলোর পূর্বাভাস করা খুব সহজ কাজ নয়।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসের ভাষাগত দিক নিয়েও রয়েছে সমালোচনা, অস্পষ্টতা। অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে এসব বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়।
যেমন আবহাওয়াবার্তায় বলা হয়, অমুক বিভাগের ‘কিছু জায়গায়’ ‘মাঝারি ভারী’ বৃষ্টিপাত হবে। এখানে দুটি পরিভাষার মানে বুঝতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে কথাটির অর্থ। একটি হলো, ‘মাঝারি ভারী’। বৃষ্টির ধরন বা মাত্রা কেমন হবে, তা বুঝতে প্রথমে বেশ কিছু বিষয় হিসাব করতে হয়। যেমন মেঘের অবস্থান, ঘনত্ব, আর্দ্রতা, বাতাসের দিক, লঘুচাপের অবস্থা ইত্যাদি। এগুলো থেকে হিসাব করা হয় কোথাও বৃষ্টি হবে কি না, হলে কী রকম বৃষ্টি হবে। এই যে বৃষ্টির পরিমাণ—এরই হিসাব করতে ব্যবহৃত হয় হালকা বর্ষণ, মাঝারি ভারী বৃষ্টিপাত ইত্যাদি।
তাহলে জেনে নেয়া যাক বৃষ্টির মাত্রা (মিলিমিটার/ দিন): হালকা বর্ষণ: ৪.৫৭ থেকে ৯.৬৪; মাঝারি বর্ষণ: ৯.৬৫ থেকে ২২.৩৪; মাঝারি ভারী বর্ষণ: ২২.৩৫ থেকে ৪৪.১৯; ভারী বর্ষণ: ৪৪.২০ থেকে ৮৮.৯০ এবং চরম ভারী বর্ষণ: ৮৯.০ বা এর বেশি।
আরেকটি বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকে, সেটা হলো ‘কিছু জায়গা’—কিছু জায়গায় বৃষ্টিপাত হবে, এর মানে কী? এখানে তো নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বলা নেই। আসলে আছে। আবহাওয়াবার্তা অনুযায়ী ‘এক-দুই জায়গা’ মানে সে অঞ্চলের ২৫ শতাংশ, ‘কিছু জায়গা’ মানে ২৬-৫০ শতাংশ, ‘অনেক জায়গা’ মানে ৫১-৭৫ শতাংশ আর ‘সব জায়গা’ মানে ১০০ শতাংশ। কিন্তু খুলনার ২৬-৫০ শতাংশ এলাকার মধ্যে ঠিক কোন এলাকাগুলো পড়বে, এটা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয় না।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জনপ্রিয়তা বাড়ছে বিডব্লিউওটি’র
বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম আবহাওয়াপ্রেমী স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা, যারা আবহাওয়া পরিস্থিতিকে সহজ ভাষায়, সাধারণ মানুষের কাছে বোধ্যগম্য করে উপস্থাপন করে, যেন দেশজুড়ে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
তাদের দেয়া পূর্বাভাস মোটামুটি মিলে যাওয়ায় সম্প্রতি সংস্থাটির জনপ্রিয়তা সচেতন নাগরিকদের কাছে বাড়ছে। ইতোমধ্যে বিডব্লিউওটি’র ফেসবুক পেইজে ফলোয়ার সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। সংস্থাটি নিয়মিত বৃষ্টিবলয়, ঝড়, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে যা বাস্তবের সঙ্গে মিলছে। তবুও সংস্থাটি তাদের প্রতিটি ঘোষণার শেষে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করতে বলছে, কারণটাও স্বাভাবিক। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করাই বিধিবদ্ধ।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















