বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলোকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। কিন্তু এই চামড়া শিল্প নগরীর পাশেও নদী, সেখানেও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যত কোনো উপায় এখনো নেই। ফলে রাসায়নিকের দূষণ থেকে পরিবেশ এখনো হুমকিতে, সেই সঙ্গে এখনো প্রশ্নে জর্জরিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসহ সার্বিক সুরক্ষা। ফলাফল, ব্যাপক সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পখাতের এখনো রপ্তানি বাণিজ্যে পিছিয়ে থাকা। তাই গার্মেন্টস শিল্পের মতো চামড়া শিল্পকেও সমৃদ্ধির পথে আনতে অংশীজনদের দাবী ছিল এই শিল্পের মালিক-শ্রমিক এবং সরকারের সমন্বিত একটি পক্ষ তৈরি করা। অবশেষে এই চাওয়া পূরণ হতে চলেছে। বাংলাদেশের চামড়াশিল্প খাতে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (ট্রাইপার্টিয়েট কনসালটেটিভ কাউন্সিল- টিসিসি) গঠন করার দাবি আমলে নিয়ে আগস্টের মধ্যে এব্যাপারে কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। অন্তবর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের উপস্থিতিতে এবং সার্বিক সহায়তার আশ্বাসে সোমবার (৭ জুলাই) পরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষাবান্ধব টেকসই চামড়া শিল্পখাত গড়তে এই বড় ঘোষণা এলো।

টিসিসি গঠনে করণীয় নির্ধারণ নিয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অংশীজন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সচিব চামড়া শিল্পের জন্য টিসিসি গঠনে আগামী মাসের মধ্যেই পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘ন্যাশনাল টিসিসির পরে গার্মেন্টসের জন্য আরেকটি টিসিসি আছে, আমি মনে করি চামড়া শিল্পখাতের জন্য আরেকটি টিসিসি হতে কোনো বাঁধা নেই। আশা করি ১৫ আগস্টের মধ্যে চামড়া শিল্পের জন্য টিসিসি গঠনের গেজেট সম্পন্ন করা যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আশা করবো টেকসই চামড়া শিল্পের সমৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দেবে এই টিসিসি। এখানে শ্রমিক-মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করার প্রচেষ্টা থাকবে। তারা টিসিসির মাধ্যমে পরিবেশগত ও শ্রমিক সুরক্ষা সংক্রান্ত শর্তাদি পূরণ করে চামড়া শিল্পখাত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ পেয়ে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করতে পারবে।’
চামড়া শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রবেশ নিশ্চিতের স্বার্থে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তৈরি পোশাক শিল্প সবপক্ষের সমন্বয়ে এখন গ্রিন ফ্যাক্টরির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। পরিবেশ-শ্রমিকের সুরক্ষা প্রাধান্য পাচ্ছে। চামড়া শিল্পকে সঠিক পথে আসতে এমন কোনো ট্র্যাজেডি হোক তা নিশ্চয়ই আমরা চাই না। চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। অথচ তা নিয়ে শ্রমিক-মালিকরা নিরব, ব্যর্থতার দায় সরকারেরও। এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হলে যে পরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে সেটা উপেক্ষিত থাকলে চলবে না।’
চামড়া শিল্পের জন্য টিসিসি গঠনে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘চামড়া শিল্পের টিসিসি’র পরামর্শ প্রতিপালন বাধ্যতামূলক না হলেও যেন সম্মান পায়, বাস্তবায়িত হয়। এই টিসিসিতে যেন শ্রমিকদের প্রতিনিধি শ্রমিকরা বাছাই করেন, মালিকদের প্রতিনিধি মালিকরা বাছাই করেন। শুধু মালিক শ্রমিক নয়, চামড়া শিল্পের বিশ্ববাজারে প্রবেশে আরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে যা পূরণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকেও এই ফোরামে যুক্ত করা দরকার হবে।’
অংশীজন সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ওশি (ওএসএইচই) ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো: আলম হোসেন। এরপর দেশের চামড়া শিল্পখাতের সম্ভাবনা-সমস্যা নিয়ে এই ফাউন্ডেশনের তৈরি একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। সভায় চামড়া শিল্পখাতের জন্য টিসিসি গঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিস্তারিত তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওশি ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম অফিসার নুসরাত জাহান।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ওমর মো. ইমরুল মহসিন, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক একেএম তারিকুল আলম, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, টিসিসি সদস্য ও শ্রমিক অধিকার কর্মী রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার প্রমুখ।
সভা সঞ্চালনা করেন ওশি ফাউন্ডেশনের ভাইস-চেয়ারপার্সন এসএম মোর্শেদ। উপস্থিত ছিলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মতিউর রহমান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের হেড অফ ইভেন্ট শাহেদ আহমেদ খন্দকার।

সমাপণী বক্তব্যে সভায় কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা আসায় শ্রম সচিবসহ উপস্থিত সবাইকে কৃতজ্ঞতা-ধন্যবাদ জানিয়ে সভা শেষ করেন ওশি (ওএসএইচই) ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এ. আর. চৌধুরী রিপন।
টেকসই চামড়া শিল্পখাত গড়ার লক্ষ্যে টিসিসি গঠনের এই সভার মূল আয়োজক ‘বিল্ডিং এ সাসটেইনেবল লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ’।
এটি একটি প্রকল্প যা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই করার লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রকল্পটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্লোবাল গেটওয়ের মাধ্যমে সলিডার সুইস, ওশি ফাউন্ডেশন , লেদার ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (এলডিএফ), প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বিলস এবং সবুজের অভিজান ফাউন্ডেশন এর সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এর মূল লক্ষ্য হল চামড়া শিল্পের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পরিবেশের উপর শিল্পের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো।
নাসিমুল শুভ 




















