পদ্মার রাজবাড়ী অংশে প্রায়ই বিশাল সব আইড়, বাঘা আইড় মাছ ধরা পড়া এবং সেসব লাখ টাকায় বিক্রির মুখরোচক খবর প্রকাশিত হচ্ছে দেশের গণমাধ্যমে। বিশালাকার এসব মাছ হাতে নিয়ে, উঁচু দামে বিক্রি করা কতিপয় মাছ ব্যবসায়ীর ছবি-ভিডিও প্রচারিত হচ্ছে ঘটা করে। আজ বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) পদ্মা নদীর রাজবাড়ী অংশ থেকে ধরা পড়া ২২ কেজির বিশালাকার একটি ঢাই বা শিলং মাছ লক্ষাধিক টাকায় বিক্রির খবর দেখা যাচ্ছে দেশের প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু এই প্রজাতির মাছ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী তফসিল্ভুক্ত। সংরক্ষিত এসব প্রজাতির মাছ ধরা ও বিক্রি আইনত দণ্ডনীয়।
অতিলোভ-অতিশিকারের কারণে বিলুপ্ত হতে থাকা দেশীয় মাছ সংরক্ষণে আইন থাকলেও আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না রাজবাড়ী জেলায়। প্রায়ই দৌলতদিয়ায় বড় বড় বাঘা আইড় বিক্রির খবর প্রকাশিত হওয়ায় সংক্ষিত এই মাছ ধরা ও বিক্রি রোধে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেছে। এরই মধ্যে এবার এত বড় ঢাই মাছ বিক্রির খবর সামনে এলো।

খবরের সূত্র ধরে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রকৃতিবার্তার পক্ষ থেকে প্রথমে রাজবাড়ি জেলার মৎস কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘বাঘা আইড়, ঢাই মাছের মতো প্রজাতিগুলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে তফসিলভুক্ত, এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আসলে বন অধিদপ্তরের। আমরা মৎস আইনের লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেই। যেমন আমাদের আইনে কোন আকৃতির মাছ কী আকারে বিক্রি নিষেধ তা বলা আছে, আমরা সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। এছাড়াও দেশীয় মাছ সংরক্ষণে প্রচারণা-সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করি। জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করি।’
জেলার এই মৎস কর্মকর্তার এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা জেনে এবার প্রকৃতিবার্তা যোগাযোগ করে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদুর রহমানের সাথে।
ব্যস্ততার ফাঁকে গোয়ালন্দের ইউএনও প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘যারা সংরক্ষিত মাছ ধরে বিক্রি বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের সঙ্গে আমরা দু’দফা থেকে তিন দফা বৈঠক করেছি। তাদের সতর্ক করেছি, পথসভা করেছি। তবে বাস্তবতা হলো, এই মাছগুলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ধরা নিষেধ। আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রয়োগে মোবাইল কোর্টের প্রসিকিউশন দিতে পারে বন বিভাগ, ফরেস্ট রেঞ্জার। কিন্তু ফরেস্ট রেঞ্জারের পোস্টিং রাজবাড়ী জেলায় নেই। এই কারণে আমরা আসলে চাইলেও শাস্তির আওতায় সেভাবে কাউকে আনতে পারছি না। আমরা সংশ্লিষ্টদের বার বার সচেতন হতে বলছি, সতর্ক করছি। ’
তিনি আরও বলেন, ‘বাঘা আইড় মাছ ধরা ও বিক্রি নিষেধ করার পর এই মাছ নিয়ে কারবার কমেছে। আজকে ঢাই মাছ (শিলং) বিক্রি হওয়ার খবর আপনার মাধ্যমে পেলাম, আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কেউ অভিযোগ দিলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’
আড়তদারের কাছ থেকে কিনে ৪ হাজার ৬০০ টাকা কেজিতে ২২ কেজির ঢাই মাছ (শিলং) বিক্রি করেছেন মাছ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান শেখ। তিনি ফেসবুকে প্রচারণা চালিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে, ইমোতে ঢাকাসহ দেশের নানা জায়গায় সামর্থবান ক্রেতাদের কাছে পদ্মার বিশাল সব মাছ সরবরাহ করেন।

প্রকৃতিবার্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঘা আইড় বিক্রি বন্ধ করার কথা শুনে তিনি আর এই মাছ বিক্রি করেন না। তবে এই বিশালাকার যে শিলং (ঢাই মাছ) তিনি আজকে বিক্রি করেছেন সেটিও যে সংরক্ষিত প্রজাতির মাছ এবং আইনগতভাবে বিক্রি নিষেধ তা তিনি জানতেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে কিনি না। আড়তে আসলে থার্ডপার্টি হিসেবে এসব বড় মাছ কিনি। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে সামর্থবান ক্রেতারা পদ্মার বড় মাছ কেনেন, আমি তাদের কাছে বিক্রি করি। বাঘা আইড় মাছের মতো আর যদি কোনো মাছ আইনত বিক্রি নিষিদ্ধ হয় তাহলে আমরা তা বিক্রি করবো না।’

শুধু শাহজাহান শেখ একা নন, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এলাকায় পদ্মা নদীতে ধরা পড়া বড় বড় বাঘা আইড়, কাতল, পাঙাশ ফেসবুক ইউটিউবে দেখিয়ে রীতিমতো ‘সেলিব্রেটি’ মাছ ব্যবসায়ী হয়েছেন উঠেছেন চান্দু মোল্লাসহ অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, বাঘা আইড় বিক্রি বন্ধে প্রশাসন সতর্ক করলেও এখনো এই মাছ বিক্রি করছেন অনেকে।
ঢাই মাছের পরিচিতি:
সাধারণত এই মাছের ওজন এক থেকে দুই কেজি হয়। বর্ষা মৌসুমে জালে মাঝেমধ্যে দু–একটি ঢাঁই মাছ ধরা পড়ে।

ঢাই বা শিলং হচ্ছে ক্যাটফিশ–জাতীয় সুস্বাদু ও খরস্রোতা নদীর আঁশবিহীন রুপালি রঙের মাছ। লম্বায় সাধারণত ১৮৩ সেন্টিমিটার, ওজনে ৩ থেকে ১০ কেজি হয়। দেখতে অনেকটা পাঙাশ মাছের মতো। মাছটির রুপালি রং এবং পাখনাগুলো লাল রঙের হয়। অন্যান্য ক্যাটফিশের তুলনায় এই মাছ ডিম কম দেয়। বর্ষায় প্রাপ্তবয়স্ক মাছ প্রজননের জন্য ছোট নদী থেকে বড় নদীতে আসে।
ওজন ও আকৃতি হিসেবে শাহজাহান শেখ যে মাছটি বিক্রি করেছেন তা আসলেই বেশ দুষ্প্রাপ্য। কারণ ২২ কেজি ৬০০ গ্রাম ওজনের ছিল মাছটি।
বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ালন্দ উপজেলার পদ্মা নদীর চরকর্নেশনা এলাকায় জেলে জীবন হলদারের জালে মাছটি ধরা পরে। জেলে জীবন হালদার বলেন, ভোর রাতে সেসহ দলবল দিয়ে পদ্মায় মাছ শিকারে বের হন। নদীর চরকর্নেশনা এলাকায় জাল ফেলেন তারা। সেখানে তাদের জালে আটকা পড়ে বিশাল আকৃতির ঢাই মাছ। পরে দৌলতদিয়ার মাছের আড়তে নিয়ে ওজন দিয়ে দেখেন, মাছটি ২২ কেজি ৬’শ গ্রামের।
ঢাই বা শিলং মাছ বাংলাদেশে একটি সংরক্ষিত মাছ প্রজাতি। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী এটি তফসিল ২ এর অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি বিপন্ন মাছ, যার শিকার করা নিষিদ্ধ। নদী দূষণ এবং পরিবেশগত কারণে এই মাছটি দেশ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
নাসিমুল শুভ 




















