গ্রামে ভোর মানে যেমন মোড়গের ডাক তেমনি এক সময় ঢাকায় ভোর মানেই কাকের ঝাঁকের কা কা রব। ধূসর গলা কালো শরীরের পাঁতিকাক কিংবা মিশমিশে কালো দাঁড়কাকের দেখা মিলতো সব জায়গায়। কিন্তু রাজধানী ঢাকাকে যারা নিবিড়ভাবে জানেন তারা খেয়াল করেছেন অবশ্যই যে নগরের এই ডানাওয়ালা নাগরিকপাখিটি আর আগের মতো বিপুল সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে না। কদাচিৎ দেখা গেলেও আগের তুলনায় কিছুই না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- রাজধানীর অন্যান্য প্রাণীর মতো এবার কাকও কি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে? উত্তরে তেঁতো সত্যটা বলতেই হচ্ছে, সেটি হলো হ্যাঁ, ঢাকা থেকে কাক হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় গত এক দশকে কাকের সংখ্যা প্রায় ৬০% কমে গেছে । একসময় ঢাকাকে “কাকের শহর” বলা হলেও এখন এই চিরচেনা পাখিটি ক্রমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
কাক কমার কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে কাক কমার প্রধান কিছু কারণ শনাক্ত করা গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বাসস্থানের অভাব: অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পুরোনো বড় গাছ (যেমন বট, রেইনট্রি, নিম) কেটে ফেলার কারণে কাক তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও বাসা তৈরির জায়গা হারাচ্ছে।
- খাদ্য সংকট ও বিষক্রিয়া: আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে খোলা ডাস্টবিন কমে যাওয়ায় তাদের খাবারের উৎস সংকুচিত হয়েছে । এছাড়া ফরমালিনযুক্ত খাবার, কীটনাশক এবং পচা উচ্ছিষ্ট খেয়ে তারা বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।
- পরিবেশ দূষণ: মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ কাকের প্রজনন ক্ষমতা ও আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে ।
- প্রযুক্তিগত প্রভাব: মোবাইল টাওয়ারের আধিক্য এবং তা থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা কাকসহ অন্যান্য পাখির বংশবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ।
- রোগবালাই: এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েও অনেক কাক মারা যাচ্ছে।

কাক কমলে মানুষের কী আসে যায়?
কাক প্রকৃতির “ঝাড়ুদার” হিসেবে পরিচিত। এদের অনুপস্থিতি পরিবেশের ভারসাম্য যেভাবে নষ্ট করছে:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত: কাক রাস্তার পচা আবর্জনা ও মৃত প্রাণী খেয়ে শহর পরিষ্কার রাখত। তারা না থাকায় আবর্জনা দ্রুত পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে ।
পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব: কাক ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ছোট ইঁদুর খেয়ে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখত। এদের অভাবে শহরে মশা, মাছি এবং ইঁদুরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে ।
বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি: কাক না থাকলে পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল (food chain) ভেঙে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রকৃতির নিজস্ব যে চক্র থাকে আমরা যেটাকে বাস্তুসংস্থান বলি তাতে কাক একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই চক্রে অন্যান্য পাখি, পতঙ্গ, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী, বৃক্ষ ইত্যাদি সবই আছে। এই চক্র থেকে কোনো স্থান শূন্য হলে তার প্রভাব হবে ইনট্যানজিবল। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো জনবহুল শহরে তা পরিবেশ বিপর্যয়ের পর্যায়ে চলে যাবে। একই কথা চড়ুই, প্রজাপতি বা বাদুড়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’

ঢাকা থেকে কাক এখনো পুরোপুরি উধাও হয়নি। বাজার, নদীতীর বা কম পরিচর্যায় থাকা এলাকায় এখনও তাদের দেখা মেলে। কিন্তু তাদের অসম বণ্টনই একটি গল্প বলে দেয়। যেখানে গাছ আছে, যেখানে বর্জ্য আছে, যেখানে বিঘ্ন কম—সেখানে কাক টিকে আছে। অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে নীরবতা।
এই ধারা শুধু ঢাকার নয়। হাওয়াইয়ান কাক ২০০২ সালে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলুপ্ত হয়—আবাসস্থল হারানো, বহিরাগত প্রজাতির শিকার ও রোগের কারণে। এখন তারা কেবল বন্দিদশায় টিকে আছে। যুক্তরাজ্যে কাকের আরেক প্রজাতি– রেড বিলড চফ ঐতিহ্যগত গবাদি পশু চরানো কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে; কারণ ছোট ঘাসভূমি না থাকায় তাদের খাদ্য কমেছে। উভয় ক্ষেত্রেই পতন ছিল ধীর, আর তার উপলব্ধি এসেছে দেরিতে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















