সংবাদ শিরোনাম ::
Logo প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন মুকিত মজুমদার বাবু Logo হাম হলে শিশুকে যেসব খাবার খাওয়াবেন Logo ২২০০ পিঁপড়া পাচার চেষ্টায় চীনা নাগরিকের এক বছরের জেল Logo চট্টগ্রামে নিজেই হাসপাতালে এসে ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা নিলো কাক! Logo বাংলাদেশে প্রতি তিন শিশুর মধ্যে এক জন মারাত্মকভাবে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে Logo এপ্রিল এখন পর্যন্ত সহনীয়, দেশে এবছরের গ্রীষ্ম কম ভোগাবে আশা আবহাওয়াবিদের   Logo আজ স্বাধীনতা পদক প্রদান করবেন প্রধানমন্ত্রী Logo ‘ধান খাওয়ায়’ মেরে ফেলা হলো বাবুই পাখির ২৯ বাচ্চা, এক জনের কারাদণ্ড Logo পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন’ জলহস্তীদের নিয়ে বিপাকে কলম্বিয়া Logo জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হতে পারে: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা
দূষণ

চামড়াশিল্পের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী

দেশ স্বাধীনের পর যে কয়টি খাতকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিবর্তন হওয়ার স্বপ্ন ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো চামড়াশিল্প। এই ভূখণ্ডে চামড়াশিল্পের বিকাশ ঘটেছে ৮০ বছরের বেশি সময় আগে। বর্তমানে চামড়াশিল্প খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চামড়াশিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলেও এই খাতকে ঘিরে যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে এই খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশদূষণের অন্যতম বড় একটি কারণ। বিশেষ করে নদীদূষণের জন্য চামড়াশিল্প খাতের দায় অনেক বেশি।
চামড়াশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রণদাপ্রসাদ সাহা (আরপি সাহা) নামের একজন ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জের কাছে সর্বপ্রথম একটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪০ সালে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকারঘোষিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকার হাজারীবাগে বুড়িগঙ্গার তীরে ট্যানারি শিল্প স্থাপিত হয়। চামড়াশিল্পের বর্জ্যের কারণে ধীরে ধীরে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। নদী রক্ষার চেষ্টা থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মহামান্য আদালতের নির্দেশে ২০১৭ সালে ট্যানারি শিল্পাঞ্চল নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে। আধুনিক অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা রেখে এই শিল্পাঞ্চল স্থাপিত হলেও এটি তেমন সুফল বয়ে আনতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, রাজধানী ঢাকা ও বুড়িগঙ্গা চামড়াশিল্পের দূষণ থেকে রক্ষা পেলেও ধলেশ্বরী নদী ধীরে ধীরে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। এ যেন একটি নদীকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

ধলেশ্বরী নদী ও নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনে চামড়াশিল্পের দূষণের প্রভাব স্পষ্ট লক্ষণীয়। ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সাভারের হেমায়েতপুরে আয়োজিত ‘Environmental issues of leather sector’ শীর্ষক এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, চামড়াশিল্প নগরীর দূষণ ও দুর্গন্ধের পরিমাণ এতই বেশি যে তিনি তার ঘরের জানালাও খুলতে পারেননি গত এক বছর ধরে। শুধু তা-ই নয়, তিনি সেই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে আরও জানিয়েছেন, দুর্গন্ধের কারণে শিশুরা এমন সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা চিকিৎসকেরাও নির্ণয় করতে পারছেন না।

এলাকাবাসী বলছেন, চামড়াশিল্পের বর্জ্যই এর জন্য দায়ী। এখানে নতুন শিল্পাঞ্চল স্থাপিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কিছুই নেই। তরল বর্জ্যের জন্য যা আছে, তা-ও বলা চলে নামমাত্র। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে খুব খারাপ কিছুই অপেক্ষা করছে ধলেশ্বরী ও তার আশপাশের এলাকার জন্য। একসময় সাভার এলাকা সবজি উৎপাদনে দেশে প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমানে সেখানে সবজি উৎপাদন কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।
সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর বর্তমান চিত্র স্বচক্ষে দেখলে মনে হবে এ যেন বুড়িগঙ্গা নদীর আরেক রূপ। ধলেশ্বরীর পানিতে দুর্গন্ধ, ধ্বংস হয়ে গেছে জীববৈচিত্র্য, মাছ হয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য। এমনকি এই নদীর পানি ব্যবহারের ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ধলেশ্বরীর পানি পরীক্ষার পর পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাভারে চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্যের দ্বারা ধলেশ্বরী নদী দূষণের মাত্রা অনেক বেশি।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে দুই ধরনের বর্জ্য উৎপাদিত হয়। কঠিন বর্জ্য এবং তরল বর্জ্য। এই দুই ধরনের বর্জ্যই নদীতে ফেলা হচ্ছে অবাধে। তরল বর্জ্যের মধ্যে থাকা রাসায়নিক কেমিক্যাল বাস্তুসংস্থানের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চামড়াশিল্পের তরল বর্জ্যের কারণে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় দেখা গেছে হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরী থেকে নির্গত পানিতে মানব ও প্রাণিদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদান ক্রোমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। পানির তাপমাত্রা থেকে শুরু করে দ্রবীভূত অক্সিজেন, ক্ষার, বিদ্যুৎ পরিবাহন, ক্রোমিয়ামের পরিমাণ, লবণের পরিমাণ, রাসায়নিক উপাদান, জৈব রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। অক্সিজেন ছাড়া বাকি সাতটি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আর অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

অক্সিজেন ছাড়া অন্য সাতটি উপাদান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি থাকা পানি পান করলে এবং ওই পানি প্রাণিদেহের সংস্পর্শে এলে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওই পানিতে প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে যাবে। আর যেগুলো বেঁচে থাকবে, সেগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠবে। যা ওই নদীর তো বটেই, এর তীরবর্তী এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।

শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরই নয়, ধলেশ্বরীর দূষণ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব গবেষণার ফলাফলের চিত্র মোটামুটি একই। তরল বর্জ্য নানাভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। তরল বর্জ্যে যেসব কেমিক্যাল থাকে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো ক্রোমিয়াম। এটি ধীরে ধীরে পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। কিন্তু এই ক্ষতি হয় দীর্ঘস্থায়ী। এটি শাকসবজি, শস্য এমনকি সুপেয় পানির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে খুব সহজেই। মানবদেহে দীর্ঘ সময় এটি প্রবেশ করতে থাকলে প্রাণঘাতী ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া এটি নদীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিসাধন করছে, যার ২০ ভাগ হয়তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাকি ৮০ শতাংশই খুব ধীরে ধীরে ঘটছে। হয়তো কয়েক বছর পর টের পাওয়া যাবে যে অবহেলার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে আমাদের অলক্ষ্যেই।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের নদীগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত। একটি নদী দূষণ হওয়া মানে এর সঙ্গে যুক্ত অন্য নদীতেও এর প্রভাব পড়বে। কাজেই চামড়াশিল্পের সব ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন না করলে সামনে দুর্দিন অপেক্ষা করছে। এসব বিষয়ে কোনো রকম অবহেলা করা হলে শুধু যে চামড়াশিল্প নগরীর আশপাশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা-ই নয়, এতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চামড়াশিল্প রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে চামড়াশিল্পে সরাসরি যুক্ত কর্মীর সংখ্যা ১০ লক্ষের বেশি। এটিকে বাড়িয়ে ৩৫ লাখ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে চাইলেই যে এটি করে ফেলা যাবে তেমনটিও নয়। বেশ কয়েকটি কারণে অপার সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়াশিল্প খাত পুরোপুরি আলোর মুখ দেখতে পারছে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চামড়াশিল্পে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে না পারা। আর এই একটি কারণেই মিলছে না যুক্তরাজ্যভিত্তিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রদত্ত খডএ সনদ। এই সনদ না থাকায় বাংলাদেশের চামড়ার মান ভালো হওয়ার পরও ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে চীনের কাছে কমদামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আর এতে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে। যদিও এর সমাধানের জন্য অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু পরিবেশদূষণ কমছে না।

বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার ৯৫ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত করা হয় সাভারের নতুন নির্মিত চামড়াশিল্প নগরীতে। চামড়াশিল্প নগরীতে বর্তমানে ১৪০টি ট্যানারি চালু রয়েছে। এতগুলো ট্যানারির উৎপাদিত তরল বর্জ্য শোধনের জন্য নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছে না। নির্মাণ ত্রুটি ও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বর্জ্য উৎপাদনের ফলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে সিইটিপি দ্বারা। সিইটিপির মাধ্যমে পানি, লবণ, ¯øাজ, কেমিক্যালস ইত্যাদির কোনোটিই ঠিকমতো পরিশোধন হচ্ছে না। ফলে তরল বর্জ্য মিশে যাচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। এরপর ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গা, কালীগঙ্গা, ভৈরব ও বালু নদীতে। দিনে দিনে এই চিত্র বাড়ছেই।
পরিবেশ দূষণের এই অবস্থা এখনই রোধ করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রকৃতি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই চামড়াশিল্পের দ্বারা আর যেন কোনো নদীর মৃত্যু না হয়, আর যেন পরিবেশ দূষিত না হয় সেজন্য মালিক, শ্রমিক এবং সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কাজ করতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ধলেশ্বরী নদী তার আগের রূপ ফিরে পাক, আবারও হয়ে উঠুক মাছের অভয়ারণ্য।

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন মুকিত মজুমদার বাবু

দূষণ

চামড়াশিল্পের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী

আপডেট সময় ০৪:২৯:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

দেশ স্বাধীনের পর যে কয়টি খাতকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিবর্তন হওয়ার স্বপ্ন ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো চামড়াশিল্প। এই ভূখণ্ডে চামড়াশিল্পের বিকাশ ঘটেছে ৮০ বছরের বেশি সময় আগে। বর্তমানে চামড়াশিল্প খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চামড়াশিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলেও এই খাতকে ঘিরে যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে এই খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশদূষণের অন্যতম বড় একটি কারণ। বিশেষ করে নদীদূষণের জন্য চামড়াশিল্প খাতের দায় অনেক বেশি।
চামড়াশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রণদাপ্রসাদ সাহা (আরপি সাহা) নামের একজন ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জের কাছে সর্বপ্রথম একটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪০ সালে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকারঘোষিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকার হাজারীবাগে বুড়িগঙ্গার তীরে ট্যানারি শিল্প স্থাপিত হয়। চামড়াশিল্পের বর্জ্যের কারণে ধীরে ধীরে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। নদী রক্ষার চেষ্টা থেকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মহামান্য আদালতের নির্দেশে ২০১৭ সালে ট্যানারি শিল্পাঞ্চল নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে। আধুনিক অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা রেখে এই শিল্পাঞ্চল স্থাপিত হলেও এটি তেমন সুফল বয়ে আনতে পারছে না। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, রাজধানী ঢাকা ও বুড়িগঙ্গা চামড়াশিল্পের দূষণ থেকে রক্ষা পেলেও ধলেশ্বরী নদী ধীরে ধীরে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। এ যেন একটি নদীকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

ধলেশ্বরী নদী ও নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনে চামড়াশিল্পের দূষণের প্রভাব স্পষ্ট লক্ষণীয়। ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সাভারের হেমায়েতপুরে আয়োজিত ‘Environmental issues of leather sector’ শীর্ষক এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, চামড়াশিল্প নগরীর দূষণ ও দুর্গন্ধের পরিমাণ এতই বেশি যে তিনি তার ঘরের জানালাও খুলতে পারেননি গত এক বছর ধরে। শুধু তা-ই নয়, তিনি সেই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে আরও জানিয়েছেন, দুর্গন্ধের কারণে শিশুরা এমন সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা চিকিৎসকেরাও নির্ণয় করতে পারছেন না।

এলাকাবাসী বলছেন, চামড়াশিল্পের বর্জ্যই এর জন্য দায়ী। এখানে নতুন শিল্পাঞ্চল স্থাপিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কিছুই নেই। তরল বর্জ্যের জন্য যা আছে, তা-ও বলা চলে নামমাত্র। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে খুব খারাপ কিছুই অপেক্ষা করছে ধলেশ্বরী ও তার আশপাশের এলাকার জন্য। একসময় সাভার এলাকা সবজি উৎপাদনে দেশে প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমানে সেখানে সবজি উৎপাদন কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।
সাভারের হেমায়েতপুরে ধলেশ্বরী নদীর বর্তমান চিত্র স্বচক্ষে দেখলে মনে হবে এ যেন বুড়িগঙ্গা নদীর আরেক রূপ। ধলেশ্বরীর পানিতে দুর্গন্ধ, ধ্বংস হয়ে গেছে জীববৈচিত্র্য, মাছ হয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য। এমনকি এই নদীর পানি ব্যবহারের ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ধলেশ্বরীর পানি পরীক্ষার পর পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাভারে চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্যের দ্বারা ধলেশ্বরী নদী দূষণের মাত্রা অনেক বেশি।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে দুই ধরনের বর্জ্য উৎপাদিত হয়। কঠিন বর্জ্য এবং তরল বর্জ্য। এই দুই ধরনের বর্জ্যই নদীতে ফেলা হচ্ছে অবাধে। তরল বর্জ্যের মধ্যে থাকা রাসায়নিক কেমিক্যাল বাস্তুসংস্থানের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চামড়াশিল্পের তরল বর্জ্যের কারণে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় দেখা গেছে হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরী থেকে নির্গত পানিতে মানব ও প্রাণিদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদান ক্রোমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। পানির তাপমাত্রা থেকে শুরু করে দ্রবীভূত অক্সিজেন, ক্ষার, বিদ্যুৎ পরিবাহন, ক্রোমিয়ামের পরিমাণ, লবণের পরিমাণ, রাসায়নিক উপাদান, জৈব রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। অক্সিজেন ছাড়া বাকি সাতটি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আর অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

অক্সিজেন ছাড়া অন্য সাতটি উপাদান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি থাকা পানি পান করলে এবং ওই পানি প্রাণিদেহের সংস্পর্শে এলে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওই পানিতে প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে যাবে। আর যেগুলো বেঁচে থাকবে, সেগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠবে। যা ওই নদীর তো বটেই, এর তীরবর্তী এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।

শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরই নয়, ধলেশ্বরীর দূষণ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব গবেষণার ফলাফলের চিত্র মোটামুটি একই। তরল বর্জ্য নানাভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। তরল বর্জ্যে যেসব কেমিক্যাল থাকে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো ক্রোমিয়াম। এটি ধীরে ধীরে পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। কিন্তু এই ক্ষতি হয় দীর্ঘস্থায়ী। এটি শাকসবজি, শস্য এমনকি সুপেয় পানির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে খুব সহজেই। মানবদেহে দীর্ঘ সময় এটি প্রবেশ করতে থাকলে প্রাণঘাতী ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া এটি নদীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিসাধন করছে, যার ২০ ভাগ হয়তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাকি ৮০ শতাংশই খুব ধীরে ধীরে ঘটছে। হয়তো কয়েক বছর পর টের পাওয়া যাবে যে অবহেলার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে আমাদের অলক্ষ্যেই।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের নদীগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত। একটি নদী দূষণ হওয়া মানে এর সঙ্গে যুক্ত অন্য নদীতেও এর প্রভাব পড়বে। কাজেই চামড়াশিল্পের সব ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন না করলে সামনে দুর্দিন অপেক্ষা করছে। এসব বিষয়ে কোনো রকম অবহেলা করা হলে শুধু যে চামড়াশিল্প নগরীর আশপাশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা-ই নয়, এতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চামড়াশিল্প রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে চামড়াশিল্পে সরাসরি যুক্ত কর্মীর সংখ্যা ১০ লক্ষের বেশি। এটিকে বাড়িয়ে ৩৫ লাখ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে চাইলেই যে এটি করে ফেলা যাবে তেমনটিও নয়। বেশ কয়েকটি কারণে অপার সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়াশিল্প খাত পুরোপুরি আলোর মুখ দেখতে পারছে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চামড়াশিল্পে পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে না পারা। আর এই একটি কারণেই মিলছে না যুক্তরাজ্যভিত্তিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রদত্ত খডএ সনদ। এই সনদ না থাকায় বাংলাদেশের চামড়ার মান ভালো হওয়ার পরও ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে চীনের কাছে কমদামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আর এতে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে। যদিও এর সমাধানের জন্য অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু পরিবেশদূষণ কমছে না।

বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার ৯৫ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত করা হয় সাভারের নতুন নির্মিত চামড়াশিল্প নগরীতে। চামড়াশিল্প নগরীতে বর্তমানে ১৪০টি ট্যানারি চালু রয়েছে। এতগুলো ট্যানারির উৎপাদিত তরল বর্জ্য শোধনের জন্য নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছে না। নির্মাণ ত্রুটি ও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বর্জ্য উৎপাদনের ফলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে সিইটিপি দ্বারা। সিইটিপির মাধ্যমে পানি, লবণ, ¯øাজ, কেমিক্যালস ইত্যাদির কোনোটিই ঠিকমতো পরিশোধন হচ্ছে না। ফলে তরল বর্জ্য মিশে যাচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। এরপর ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গা, কালীগঙ্গা, ভৈরব ও বালু নদীতে। দিনে দিনে এই চিত্র বাড়ছেই।
পরিবেশ দূষণের এই অবস্থা এখনই রোধ করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রকৃতি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই চামড়াশিল্পের দ্বারা আর যেন কোনো নদীর মৃত্যু না হয়, আর যেন পরিবেশ দূষিত না হয় সেজন্য মালিক, শ্রমিক এবং সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কাজ করতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ধলেশ্বরী নদী তার আগের রূপ ফিরে পাক, আবারও হয়ে উঠুক মাছের অভয়ারণ্য।