প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি কোরাল বা প্রবাল। আমরা নানা টিভি-ফোনের স্ক্রিনে যে নীলচে স্বচ্ছ সাগর দেখি তার মূল কারণ ওসব সাগরের নিচে আছে প্রবাল। যেমন বাংলাদেশে সমুদ্রের নীলচে সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্র। এটির এই রূপের কারণ সেন্ট মার্টন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। যা হোক, ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে একটা শঙ্কা জাগানো খবর জানানো যাক। প্রবাল সমৃদ্ধ এলাকাগুলোকে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তন।
খবর প্রকাশিত হয়েছে, ৪০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তাপের মুখে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় শহর কুইন্সল্যান্ডের কোরাল সাগরে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রবাল প্রাচীরটির অস্তিত্বই এখন বিলীন হতে চলেছে। পৃথিবীর চমৎকার এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে এই মহাশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

তাদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে নামকরা ম্যাগাজিক নেচারে। সেখান থেকে গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যাদির চুম্বকাংশ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের পুরনো প্রবাল থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করে জানা গেছে এই এলাকায় সাগরের তাপমাত্রা ৪’শ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। প্রবালের দেহের ভেতরে পূর্বের সময়কার তাপের রেকর্ড প্রাকৃতিকভাবে থেকে যায়, এই রেকর্ড বিশ্লেষণ করেই গবেষকরা শঙ্কা জাগানো তথ্য পেয়েছেন। গবেষকরা জানতে পেরেছেন, ১৬১৮ সালের পর এই বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের তাপমাত্রা ছিল সর্বোচ্চ। তারা বলেছেন, সাগরের তাপমাত্রা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে পৃথিবীর এই চমৎকার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
তাপ বাড়লে প্রবালের কী হবে?
আরে প্রবাল তো পাথরের মতো, সাগরের তাপমাত্রা বাড়লে প্রবালের আবার কী আসে যায়? শুরুতেই জেনে রাখা ভাল যে, বিশাল প্রাণিজগতের মধ্যে প্রবাল একটি অনন্য প্রাণী। কিছু প্রবাল দেখতে শাখাসহ গাছের ঝোপের মতো, আবার কিছু প্রজাতি দেখতে ফুলের মতো। এই অসাধারণ রূপের কারণে দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরাও নির্ধারণ করতে পারেননি যে প্রবাল আসলে কী? ১৮২৭ সালে ফরাসি প্রকৃতিবিদ হেনরি মারিঁ ডে পেসোনেল প্রথমবারের মতো নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছিলেন, প্রবালগুলো মোটেই সামুদ্রিক উদ্ভিদ নয়, বরং প্রাণী।
‘সাইফোনোফোরা’ নামের বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এই প্রবাল প্রাণী পলিপ নামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবের সমন্বয়ে গঠিত। এরা একধরনের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী।
প্রবাল সাধারণত কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। একটি কলোনিতে অসংখ্য পলিপ থাকে, যারা জিনগতভাবে, অর্থাৎ জেনেটিক্যালি অভিন্ন। প্রবাল পলিপ যদিও জেলিফিশের মতো নরম, তবে এরা প্রতিরক্ষার জন্য নিজেদের দেহের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণ করে শক্ত পাথুরে খোলস বা বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে। খোলসটি পলিপকে স্থিতিশীলতা প্রদান করে এবং তাদের স্রোত ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। প্রবাল পলিপের দেহে ‘জোয়ান্থোজেলিন’ নামের শৈবাল থাকে। শৈবাল সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে এবং প্রবালের পলিপকে খাবার সরবরাহ করে। পলিপ শৈবালকে নিরাপদে বসবাসের অবলম্বন দেয়। একে বলে মিউচুয়ালিজম। পরস্পরের ওপর নির্ভর করে প্রকৃতিতে টিকে থাকে।
গবেষকরা বলছেন, সাগরে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কোরাল ব্লিচিং ঘটে বা প্রবাল প্রাণ হারিয়ে সাদা হয়ে যায়। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রঙিন কাপড় বেশি ধুলে কাপড় তার উজ্জ্বলতা হারায়। একইভাবে রঙিন প্রবালপ্রাচীরের রং সাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলেন কোরাল ব্লিচিং। প্রবাল সাদা হয়ে গেলে শুরু হয় ক্ষয়।

সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা খুব বেড়ে গেলে এসব জোয়ান্তোজেলিন বা অ্যালগেই আর প্রবালের শরীরে থাকতে পারে না। খুব বেশি দিন শৈবাল ছাড়া থাকলে প্রবাল ধীরে ধীরে সাদা রঙ ধারণ করে, একসময় খাবারের অভাবে মারা যেতে থাকে।
তাহলে সাগরে তাপ বৃদ্ধির কারণ?
গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সাগরের উষ্ণতা বাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বেশি থাকবে, ততক্ষণ সাগরগুলো শক্তি শোষণ করতে থাকবে। এতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা চলতেই থাকবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্মনের পেছনে মূলত দায়ী মানুষ। ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে বাড়ছে গ্রিনহাউস গ্যাস।
নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা হুলবে বলেন, যত দিন বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়বে, তত দিন বায়ুমণ্ডল ও সাগর উভয়ই উষ্ণ হতে থাকবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে পারলে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রবণতা পরিবর্তন হবে। খুব দেরি হওয়ার আগে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ বন্ধ করা খুব দরকার।
নাসিমুল শুভ 














