দেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
রোববার (৮ মার্চ) রাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
সাখাওয়াত আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিছুদিন আগে তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। তখন কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে বাসায় নেওয়া হয়। রোববার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, দুই নাতিসহ অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি শিক্ষকতার ক্ষেত্রে সব সময় শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশে জোর দিতেন। সাংবাদিকতা ও রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া ছিল তার গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
১৯৪১ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধনুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা কলেজিয়েট সরকারি হাইস্কুল এবং ঢাকা কলেজ থেকে পর্যায়ক্রমে তিনি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। অধ্যাপক খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক (সম্মান), এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রাবস্থাতেই তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। প্রায় ১০ বছর তিনি সাংবাদিকতার মূলস্রোতে কাজ করেছেন। প্রতিবেদক থেকে শুরু করে সম্পাদনা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর পেশাদারি দক্ষতা তাঁকে অনন্য এক সংবাদসৈনিকের মর্যাদার আসনে আসীন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের আত্মপ্রকাশকাল থেকেই তিনি এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িত। ১৯৬২ সালে বিভাগের পথচলার শুরুতেই এই বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পাশাপাশি একই বছরে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। ডিপ্লোমা পাসের সাত বছর পর ১৯৬৯ সালে বিভাগে এমএ প্রোগ্রাম চালু হলে এমএ শেষ পর্বে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে তিনি সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর নিজ বাড়িটি মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে পরিণত হলে তিনি গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠক ও পরামর্শক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অবদান রাখার সুযোগ পান। যুদ্ধ শেষে পরীক্ষার ফল বের হলে সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম ব্যাচ থেকে তিনি কৃতিত্ব সহকারে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক ডিসিপ্লিনের শিক্ষাগত ভিত্তি তাঁকে গড়ে তোলে এক বহুমাত্রিক চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে। বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের চার বছরের মাথায় ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। দুই দফায় বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাংবাদিকতা বিভাগটিকে নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে সময়োপযোগী উত্তরণ ঘটিয়ে আপন আলোয় সমৃদ্ধতর বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর হাত ধরে দিনে দিনে বিভাগটি সম্প্রসারিত হতে থাকে।
দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং ২০০৮ সালে সেখান থেকে অবসরে যান। পরে পাঁচ বছর তিনি একই বিভাগে সুপার নিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিভাগটির অনারারি প্রফেসর ছিলেন।
এছাড়া তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন উপদেষ্টা এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















