মাঘের আজ ১০ তারিখ, অথচ ঢাকায় যেন বসন্তকালের আবহাওয়া, দুপুরে গরম! প্রকৃতির এই বদলে যাওয়া চেহারার জন্য দায়ী মানুষের ভোগবাদী আচরণ এবং অসামঞ্জ্যপূর্ণ ও সর্বগ্রাসী প্রবণতা। তাই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মানুষের মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে প্রজন্মের ভাবনায় পরিবর্তন দরকার। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজ প্রাঙ্গনে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) শুরু হয়েছে ন্যাশনাল নেচার সামিট-২০২৬। এটি সম্মেলনের ১৬ তম আসর। দু’দিনের এই সম্মেলন চলবে রবিবার (২৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত।

প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় নবীনদের মাঝে আগ্রহ জাগাতে এবং শব্দ, বায়ু, প্লাস্টিক দূষণ রোধে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে এই সম্মেলন আয়োজন করে আসছে নটর ডেম নেচার স্টাডি ক্লাব। শনিবার সকাল ১০টায় নটর ডেম কলেজের নবনির্মিত ফাদার বেঞ্জামিন প্রাঙ্গনে (শেডে) জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বর্ণিল বেলুন উড়িয়ে নেচার সামিটের ১৬ তম আসরের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. ফারহিনা আহমেদ পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা এবং এই পৃথিবীকে, এই দেশকে বাসযোগ্য রেখে যেতে সবাইকে এখনই দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। সবাইকে কেবল সাময়িক উন্নয়নের চিন্তা না করে টেকসই উন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
পরিবেশ সচিব বলেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা পাবে এমন টেকসই উন্নয়ন কাম্য। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ মাটি, পানি, বাতাস, জলাধার, খাল, নদ-নদী, হাওর, সমুদ্র, পাহাড়। এগুলো এতো প্রজ্ঞার সাথে ব্যবহার করতে হবে যেন এসব উৎস পরিবর্তিত রেখে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দিয়ে যেতে পারি।’
অতিরিক্ত লাভের আশায় কৃষিতে রাসায়নিক ও কীটনাশক, পরিশোধনাগার ছাড়াই যত্রতত্র শিল্পকারখানা, অহেতুক শব্দদূষণ করাসহ নানা দূষণের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
এসবে সাময়িক উন্নতি আসলেও দীর্ঘমেয়াদে এসবের কারণে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি, উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস এবং জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিও সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন সচিব।

ড. ফারহিনা সবাইকে পরিবেশবান্ধব জীবনাচরণে অভ্যস্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কী জিনিস আমি ব্যবহার করবো, কী কাপড় আমি পরবো, সেখানে কী রং ব্যবহার হয়েছে, কোন কারখানায় উৎপাদন হয়েছে, এসব কারখানা কতটা দূষণ করছে এসব ভাবার সময় এসেছে। আমরা ঘরে যে ডিটারজেন্ট, সাবান-শ্যাম্পু ব্যবহার করছি আমাদের এসব সম্পর্কে বুঝতে হবে।’
বক্তব্যে তিনি জোরালোভাবে বাজারকেন্দ্রীক জীবনাচরণ থেকে সরে প্রকৃতিকেন্দ্রীক জীবনধারায় ফেরার আহ্বান জানান। এসময় তিনি সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্যের স্বার্থে আগ্রাসী পর্যটন সীমিত করার পক্ষে সরকারের অবস্থানের পক্ষেও যুক্তি তুলে ধরেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ হাইড্রো-ক্লাইমেট এন্ড ওশেন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার দাস বলেন, ‘আমরা এক সময় বাংলাদেশে কেবল দুর্যোগের কথা বলতাম, এখন এর সাথে যুক্ত হয়েছে দূষণ। বাংলাদেশ দুর্যোগ ও দূষণের দেশ, এটা আমরা বলতে চাই না। আমরা যদি দুর্যোগ-দূষণ রুখতে চাই তাহলে এই সম্মেলনের মতো সচেতনতা কার্যক্রম, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার এরকম আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে হবে। এই সম্মেলনে দেখছি নতুন প্রজন্মের নতুন মনের সম্মিলনে শব্দ দূষণ, ন্যানো প্লাস্টিক, স্মার্ট সিটিসহ নানা প্রজেক্ট-উদ্ভাবন তারা নিয়ে এসেছে।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে নটর ডেম নেচার স্টাডি ক্লাবের মডারেটর সহকারী অধ্যাপক বিপ্লব কুমার দেব জানান, এবারের সম্মেলনে স্কুল-কলেজ মিলিয়ে দেশের ৬৪ জেলার ২০০ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৩০০ শিক্ষার্থী-প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও। অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ-এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এএসএম রহমত উল্লাহ ভুঁইয়া প্রমুখ।

সম্মেলনের ফাঁকে দিনব্যাপী চলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, নেচার এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি, জলবায়ুবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পরিবেশবান্ধব প্রজেক্ট সহ বৈচিত্র্যময় আয়োজন।
সদ্য সমাপ্ত জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০’র আদলে চলে মক সংবাদসম্মেলন, ছিল ওয়ার্কশপ এবং সেমিনারও। এরপর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় আগতদের স্পৃহা ধরে রাখে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

সম্মেলন ভেন্যুতে আছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, বন অধিদপ্তর, জাতীয় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইনস্টিটিউট, সেভ দ্য চিলড্রেন, ব্র্যাক সিডের স্টলসহ আরও কয়েকটি স্টল। স্টলগুলোতে নানা ইউনিফর্মে আসা কৌতুহলী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিগত কয়েক আসরের মতো এবারের নেচার সামিট আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতায় আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারত্বমূলক প্রকল্প’। সহ-আয়োজক হিসেবে আছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং মিডিয়া পার্টনার হিসেবে আছে লাল-সবুজের চ্যানেল আই।
নাসিমুল শুভ 




















