সংবাদ শিরোনাম ::
Logo প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন মুকিত মজুমদার বাবু Logo হাম হলে শিশুকে যেসব খাবার খাওয়াবেন Logo ২২০০ পিঁপড়া পাচার চেষ্টায় চীনা নাগরিকের এক বছরের জেল Logo চট্টগ্রামে নিজেই হাসপাতালে এসে ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা নিলো কাক! Logo বাংলাদেশে প্রতি তিন শিশুর মধ্যে এক জন মারাত্মকভাবে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে Logo এপ্রিল এখন পর্যন্ত সহনীয়, দেশে এবছরের গ্রীষ্ম কম ভোগাবে আশা আবহাওয়াবিদের   Logo আজ স্বাধীনতা পদক প্রদান করবেন প্রধানমন্ত্রী Logo ‘ধান খাওয়ায়’ মেরে ফেলা হলো বাবুই পাখির ২৯ বাচ্চা, এক জনের কারাদণ্ড Logo পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন’ জলহস্তীদের নিয়ে বিপাকে কলম্বিয়া Logo জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হতে পারে: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

পলিথিন ব্যাগ, পিভিসি ব্যানারের বিকল্পগুলো পরিবেশবান্ধব নাকি ‘ধোঁকা’

  • নাসিমুল শুভ
  • আপডেট সময় ০৪:৪৭:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪
  • 260

পলিথিন ব্যাগ,পিভিসি ব্যানারের বিকল্পগুলো পরিবেশবান্ধব নাকি ‘ধোঁকা’

প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের মানবসৃষ্ট উপকরণগুলোর একটি হলো পলিথিন । সহজলভ্য এবং সস্তার এই পলিথিন বাংলাদেশতো বটেই পুরো বিশ্বের পরিবেশকে ফেলেছে হুমকির মুখে। পলিথিনের গ্রাসে হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যেই গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে যোগ হয়েছে পিভিসি ব্যানার নামের আরেক বিপদ। বিগত সরকারগুলো পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এই বাস্তবতায় দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশ পরিচালনা করছে অন্তবর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আছেন দেশের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অক্টোবরে সুপারশপ এবং নভেম্বর থেকে দেশের সব বাজারে পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক সব সভা-সেমিনারে বার বার পিভিসি ব্যানারের বদলে কাপড়ের ব্যানারে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

যদিও অপচনশীল এসব পলি-অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় উন্নত দেশগুলো আগেভাগে পেলেও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এখনো বিকল্প সন্ধানে পিছিয়ে। পরিবেশ আইন ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে বেশ চটকদার নামে বাজারে আছে পলিথিন-পিভিসির বিকল্প। কিন্তু এসব তথাকথিত বিকল্প আদৌ কতটুকু পরিবেশবান্ধব সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কাপড়ের ছদ্মবেশে টিস্যুব্যাগ

বাজারে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধের বিষয়ে কড়াকড়ি আসতেই দেখা যায় কাপড়ের মতো দেখতে একরকমের রঙিন ব্যাগে সয়লাব বাংলাদেশ। সেটির নাম ‘টিস্যুব্যাগ’! কাপড়ের মতো দেখতে হলেও টিস্যু ব্যাগ আসলে পলিপ্রোপিলিন। প্রকারান্তরে সেই পলিথিন-প্লাস্টিকই।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের সামনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধের ব্যাপারেও জোর দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরির প্রধান উপকরণ প্লাস্টিক। তবে পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরির প্লাস্টিকের ধরন কিছুটা আলাদা। তবে এই ব্যাগও একই রকমভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। এটি সব সময়েই নিষিদ্ধ ছিল। এখন শুধু নতুন করে ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

টিস্যু ব্যাগ অথবা পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরি হয় পলিপ্রোপিলিন পলিমার দিয়ে, যা তাপ এবং বাতাসের মাধ্যমে তুলার মত লম্বা ফ্লাফি সুতা আকারে স্পিন করা হয়। তারপর সুতাগুলোকে গরম রোলারের মধ্যে চাপ দিয়ে অনেকটা নমনীয় কিন্তু শক্ত ফেব্রিক্স তৈরি করা হয়। এই ধরনের ফেব্রিক্স বুননের টেক্সচারের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। ফলে দেখতে কাপড়ের ব্যাগের মতই মনে হয়।

পরিবেশ উপদেষ্টা জানান, পলিথনের যে কোন ধরনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক যেভাবেই তৈরি হোক না কেন তা সহজে পচে না। এই ব্যাগ ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হলে মাটির সঙ্গে মিশতে সময় নেয় প্রায় সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর। পলিপ্রোপিলিন ব্যাগে থাকা রাসায়নিক পদার্থ স্বাভাবিক গুণাবলীও নষ্ট করে দেয়।

পিভিসি বিপদের বিকল্প কি পলিয়েস্টার?

এক সময় কাপড়ের সুনিপুণ লিখনশৈলীর ব্যানার দেখা যেতো। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত নীলক্ষেতের ব্যানার তৈরির দোকানগুলোতে দেখা যেতো ভীষণ ব্যস্ততা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সভা-সেমিনার অনুষ্ঠানে ঝা চকচকে চমৎকার প্রিন্ট এবং কাপড়ের চেয়ে দ্রুত সময়ে হাতে পাওয়ার কারণে পিভিসি ব্যানার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন কাপড়ের ব্যানার ব্যবহার করে বামপন্থী সংঠন আর পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তবে কয়েক বছর ধরে সরকারি পর্যায় থেকে পিভিসি ব্যানার বাদ দিয়ে আবার কাপড়ের ব্যানারে ফিরতে বলা হচ্ছে। বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও সভা-সেমিনারে কাপড়ের ব্যানার ব্যবহার করতে বলছেন।

কিন্তু পিভিসি ব্যানারের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যানার নামে যা চালিয়ে দেওয়া হয় সেই কাপড়ও আসলে পলিয়েস্টার। যা কিনা পলিথিনের মতোই পেট্রোলিয়াম উপাদানের পণ্য। এটিও পচনশীল নয় এবং ল্যান্ডফিলে বহু বছর অক্ষত অবস্থায় থাকে।

পলিথিন ব্যাগ ও পিভিসির পরিবেশবান্ধব বিকল্প নিয়ে অনেকদিন কাজ করছেন ; পলকা বায়োপ্লাস্টিক ও পলকা ফ্লেক্স ব্যানারের উদ্ভাবক মাহবুব সুমন।

পিভিসির বিকল্পের নামে ধোঁকা নিয়ে প্রকৃতিবার্তার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার বা ডিজিটাল ব্যানার ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন, সমাবেশ, মিছিল, মিলাদ মাহফিল, জন্মদিন, মিটিং, কনফারেন্সে পিভিসি বা ডিজিটাল ব্যানার প্রিন্ট করা হচ্ছে। সহজে ডিজাইন ও প্রিন্ট করা যায় বিধায় না জেনে আমরা এক ভয়ানক বিষাক্ত জিনিসের সঙ্গে বসবাস করছি। পিভিসি (পলি ভিনাইল ক্লোরাইড) হলো এক ধরনের থার্মোপ্লাস্টিক। কম দাম, কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি ও বহু ধরনের পণ্য তৈরি করা যায় বিধায় পিভিসি খুব সহজেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বহু পণ্যের মূল রাসায়নিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। এ সব কারণে যত্রতত্র পিভিসি বর্জ্য বাড়ছে ভয়ানক গতিতে। এই পিভিসি পণ্যগুলোর একটা হলো পিভিসির ওপর ফ্লেক্সিবল পলিস্টারের কোটিং দেওয়া অ্যাডভারটাইজিং ব্যানার। যা পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার বা ডিজিটাল ব্যানার নামে বেশি পরিচিত।’

পলকা বায়োপ্লাস্টিক ও পলকা ফ্লেক্স ব্যানারের উদ্ভাবক

তিনি আরও জানান, পিভিসির ওপর পলিস্টারের আরেকটা বাড়তি কোটিং থাকার কারণে একে রিসাইকেল করা খুবই কঠিন। আবার এই জিনিসটা তৈরি করতে গিয়ে ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রচুর পরিমাণে সলিড বর্জ্য তৈরি করে, পাশাপাশি ব্যাপক পরিমাণ পানির ব্যবহার, বায়ু দূষণ এবং নানান রকম বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে ছড়াচ্ছে।

তিনি বর্তমান বাজারে প্রচলিতপন্থাগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘আসলে মুখে মুখে পচনশীলতার সার্টিফিকেট প্রমাণ হয়না জিনিসটা নিরাপদ। কিছু প্লাস্টিকও পচনশীল। তবে সেসব পচনের সময় বেশী (৫০০ থেকে ১০০০ বছর) লাগে। এখন বিকল্প হিসেবে সার্টিফিকেট নিয়ে অনেক জিনিসই বাজারে বিক্রি হচ্ছে যা প্লাস্টিকের দূষণ কমাচ্ছে না, বাড়াচ্ছে।’

মাহবুব আরও জানান, ‘আরো দুইটা জিনিস এসেছে। একটা হলো গতানুগতিক ৭০% প্লাস্টিকের সাথে পচনশীল কর্ন স্টার্চ বা সেলুলোজ ম্যাটেরিয়াল ৩০% মিক্স করে পলিথিনের বিকল্প ব্যাগ। এটা পচনশীল নিরাপদ ব্যাগের নামে সোজাসাপটা প্রতারণা। এই ধরনের ব্যাগের পচনশীল অংশগুলো পচে যাবে। প্লাস্টিক এলিমেন্টগুলো থেকে যাবে। সেই একই বিষক্রিয়া ছড়াবে।’

সমাধান কী? 

এখন কিছু বায়োপ্লাস্টিক ম্যাটেরিয়াল বাজারে এসেছে। সেটা হলো পলিল্যাকটিক অ্যাসিড বা পিএলএ। এগুলো থার্মোপ্লাস্টিক তবে পচনশীল। যদিও এই পচনের জন্যও প্রায় শত বছর সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ পলিথিনের এধরনের বিকল্পের আগে এসব ব্যবহারের পর পুনঃসংগ্রহ এবং রিসাইকেল ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

এবিষয়ে মাহবুবের পরামর্শ, এসব পলি কম্পোস্টিং ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে সেখানে নির্দিষ্ট তাপে, আদ্রতায় পচাতে হয়। সাধারনভাবে মাটিতে পড়ে থাকলে ১০০ বছর লাগে পচতে। ব্যাকএন্ড কম্পোস্টিং ইন্ডাস্ট্রি না থাকলে পিএলএ ভিত্তিক ব্যাগও আগের প্লাস্টিকের মতই দূষণ করবে। বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি কোনো কম্পোস্টিং প্লান্ট নাই। থাকলেও আরো জটিলতা আছে। বাজারে যত পিএলএ ব্যাগ যাবে তার সবগুলো কালেকশান হয়ে এই কম্পোস্টিং প্ল্যান্টে আনা না গেলে সবই কেবল কথার কথা হয়ে যাবে।

প্রকৃতিবার্তাকে এই তরুণ উদ্ভাবক-উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এমন কিছু না আসুক যাতে মূল সমস্যাকে সমাধান না করে মানুষের চোখে ঠুলি পরিয়ে প্রতারণা করা যাবে। খেয়াল রাখা দরকার – দেশটা আমার, আপনার। প্রতারণা আমরা অপরের সাথে করছিনা। করছি নিজের সাথে।’

তবে সব দিক দিয়ে পলিথিনের বিকল্প খুঁজতে আবারও প্রকৃতিতে ফিরতে বলছেন সচেতনরা। সেই গ্রামবাংলার মাছ কেনার খালৈ কিংবা পাটের ব্যাগই বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির আদি ও পরীক্ষিত ভরসা।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন মুকিত মজুমদার বাবু

পলিথিন ব্যাগ, পিভিসি ব্যানারের বিকল্পগুলো পরিবেশবান্ধব নাকি ‘ধোঁকা’

আপডেট সময় ০৪:৪৭:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪

প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের মানবসৃষ্ট উপকরণগুলোর একটি হলো পলিথিন । সহজলভ্য এবং সস্তার এই পলিথিন বাংলাদেশতো বটেই পুরো বিশ্বের পরিবেশকে ফেলেছে হুমকির মুখে। পলিথিনের গ্রাসে হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যেই গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে যোগ হয়েছে পিভিসি ব্যানার নামের আরেক বিপদ। বিগত সরকারগুলো পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এই বাস্তবতায় দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশ পরিচালনা করছে অন্তবর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আছেন দেশের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অক্টোবরে সুপারশপ এবং নভেম্বর থেকে দেশের সব বাজারে পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক সব সভা-সেমিনারে বার বার পিভিসি ব্যানারের বদলে কাপড়ের ব্যানারে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

যদিও অপচনশীল এসব পলি-অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় উন্নত দেশগুলো আগেভাগে পেলেও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এখনো বিকল্প সন্ধানে পিছিয়ে। পরিবেশ আইন ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে বেশ চটকদার নামে বাজারে আছে পলিথিন-পিভিসির বিকল্প। কিন্তু এসব তথাকথিত বিকল্প আদৌ কতটুকু পরিবেশবান্ধব সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কাপড়ের ছদ্মবেশে টিস্যুব্যাগ

বাজারে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধের বিষয়ে কড়াকড়ি আসতেই দেখা যায় কাপড়ের মতো দেখতে একরকমের রঙিন ব্যাগে সয়লাব বাংলাদেশ। সেটির নাম ‘টিস্যুব্যাগ’! কাপড়ের মতো দেখতে হলেও টিস্যু ব্যাগ আসলে পলিপ্রোপিলিন। প্রকারান্তরে সেই পলিথিন-প্লাস্টিকই।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের সামনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধের ব্যাপারেও জোর দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরির প্রধান উপকরণ প্লাস্টিক। তবে পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরির প্লাস্টিকের ধরন কিছুটা আলাদা। তবে এই ব্যাগও একই রকমভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। এটি সব সময়েই নিষিদ্ধ ছিল। এখন শুধু নতুন করে ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

টিস্যু ব্যাগ অথবা পলিপ্রোপিলিন ব্যাগ তৈরি হয় পলিপ্রোপিলিন পলিমার দিয়ে, যা তাপ এবং বাতাসের মাধ্যমে তুলার মত লম্বা ফ্লাফি সুতা আকারে স্পিন করা হয়। তারপর সুতাগুলোকে গরম রোলারের মধ্যে চাপ দিয়ে অনেকটা নমনীয় কিন্তু শক্ত ফেব্রিক্স তৈরি করা হয়। এই ধরনের ফেব্রিক্স বুননের টেক্সচারের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। ফলে দেখতে কাপড়ের ব্যাগের মতই মনে হয়।

পরিবেশ উপদেষ্টা জানান, পলিথনের যে কোন ধরনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক যেভাবেই তৈরি হোক না কেন তা সহজে পচে না। এই ব্যাগ ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হলে মাটির সঙ্গে মিশতে সময় নেয় প্রায় সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর। পলিপ্রোপিলিন ব্যাগে থাকা রাসায়নিক পদার্থ স্বাভাবিক গুণাবলীও নষ্ট করে দেয়।

পিভিসি বিপদের বিকল্প কি পলিয়েস্টার?

এক সময় কাপড়ের সুনিপুণ লিখনশৈলীর ব্যানার দেখা যেতো। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত নীলক্ষেতের ব্যানার তৈরির দোকানগুলোতে দেখা যেতো ভীষণ ব্যস্ততা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সভা-সেমিনার অনুষ্ঠানে ঝা চকচকে চমৎকার প্রিন্ট এবং কাপড়ের চেয়ে দ্রুত সময়ে হাতে পাওয়ার কারণে পিভিসি ব্যানার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন কাপড়ের ব্যানার ব্যবহার করে বামপন্থী সংঠন আর পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তবে কয়েক বছর ধরে সরকারি পর্যায় থেকে পিভিসি ব্যানার বাদ দিয়ে আবার কাপড়ের ব্যানারে ফিরতে বলা হচ্ছে। বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও সভা-সেমিনারে কাপড়ের ব্যানার ব্যবহার করতে বলছেন।

কিন্তু পিভিসি ব্যানারের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যানার নামে যা চালিয়ে দেওয়া হয় সেই কাপড়ও আসলে পলিয়েস্টার। যা কিনা পলিথিনের মতোই পেট্রোলিয়াম উপাদানের পণ্য। এটিও পচনশীল নয় এবং ল্যান্ডফিলে বহু বছর অক্ষত অবস্থায় থাকে।

পলিথিন ব্যাগ ও পিভিসির পরিবেশবান্ধব বিকল্প নিয়ে অনেকদিন কাজ করছেন ; পলকা বায়োপ্লাস্টিক ও পলকা ফ্লেক্স ব্যানারের উদ্ভাবক মাহবুব সুমন।

পিভিসির বিকল্পের নামে ধোঁকা নিয়ে প্রকৃতিবার্তার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার বা ডিজিটাল ব্যানার ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন, সমাবেশ, মিছিল, মিলাদ মাহফিল, জন্মদিন, মিটিং, কনফারেন্সে পিভিসি বা ডিজিটাল ব্যানার প্রিন্ট করা হচ্ছে। সহজে ডিজাইন ও প্রিন্ট করা যায় বিধায় না জেনে আমরা এক ভয়ানক বিষাক্ত জিনিসের সঙ্গে বসবাস করছি। পিভিসি (পলি ভিনাইল ক্লোরাইড) হলো এক ধরনের থার্মোপ্লাস্টিক। কম দাম, কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি ও বহু ধরনের পণ্য তৈরি করা যায় বিধায় পিভিসি খুব সহজেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বহু পণ্যের মূল রাসায়নিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। এ সব কারণে যত্রতত্র পিভিসি বর্জ্য বাড়ছে ভয়ানক গতিতে। এই পিভিসি পণ্যগুলোর একটা হলো পিভিসির ওপর ফ্লেক্সিবল পলিস্টারের কোটিং দেওয়া অ্যাডভারটাইজিং ব্যানার। যা পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার বা ডিজিটাল ব্যানার নামে বেশি পরিচিত।’

পলকা বায়োপ্লাস্টিক ও পলকা ফ্লেক্স ব্যানারের উদ্ভাবক

তিনি আরও জানান, পিভিসির ওপর পলিস্টারের আরেকটা বাড়তি কোটিং থাকার কারণে একে রিসাইকেল করা খুবই কঠিন। আবার এই জিনিসটা তৈরি করতে গিয়ে ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রচুর পরিমাণে সলিড বর্জ্য তৈরি করে, পাশাপাশি ব্যাপক পরিমাণ পানির ব্যবহার, বায়ু দূষণ এবং নানান রকম বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে ছড়াচ্ছে।

তিনি বর্তমান বাজারে প্রচলিতপন্থাগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘আসলে মুখে মুখে পচনশীলতার সার্টিফিকেট প্রমাণ হয়না জিনিসটা নিরাপদ। কিছু প্লাস্টিকও পচনশীল। তবে সেসব পচনের সময় বেশী (৫০০ থেকে ১০০০ বছর) লাগে। এখন বিকল্প হিসেবে সার্টিফিকেট নিয়ে অনেক জিনিসই বাজারে বিক্রি হচ্ছে যা প্লাস্টিকের দূষণ কমাচ্ছে না, বাড়াচ্ছে।’

মাহবুব আরও জানান, ‘আরো দুইটা জিনিস এসেছে। একটা হলো গতানুগতিক ৭০% প্লাস্টিকের সাথে পচনশীল কর্ন স্টার্চ বা সেলুলোজ ম্যাটেরিয়াল ৩০% মিক্স করে পলিথিনের বিকল্প ব্যাগ। এটা পচনশীল নিরাপদ ব্যাগের নামে সোজাসাপটা প্রতারণা। এই ধরনের ব্যাগের পচনশীল অংশগুলো পচে যাবে। প্লাস্টিক এলিমেন্টগুলো থেকে যাবে। সেই একই বিষক্রিয়া ছড়াবে।’

সমাধান কী? 

এখন কিছু বায়োপ্লাস্টিক ম্যাটেরিয়াল বাজারে এসেছে। সেটা হলো পলিল্যাকটিক অ্যাসিড বা পিএলএ। এগুলো থার্মোপ্লাস্টিক তবে পচনশীল। যদিও এই পচনের জন্যও প্রায় শত বছর সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ পলিথিনের এধরনের বিকল্পের আগে এসব ব্যবহারের পর পুনঃসংগ্রহ এবং রিসাইকেল ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

এবিষয়ে মাহবুবের পরামর্শ, এসব পলি কম্পোস্টিং ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে সেখানে নির্দিষ্ট তাপে, আদ্রতায় পচাতে হয়। সাধারনভাবে মাটিতে পড়ে থাকলে ১০০ বছর লাগে পচতে। ব্যাকএন্ড কম্পোস্টিং ইন্ডাস্ট্রি না থাকলে পিএলএ ভিত্তিক ব্যাগও আগের প্লাস্টিকের মতই দূষণ করবে। বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি কোনো কম্পোস্টিং প্লান্ট নাই। থাকলেও আরো জটিলতা আছে। বাজারে যত পিএলএ ব্যাগ যাবে তার সবগুলো কালেকশান হয়ে এই কম্পোস্টিং প্ল্যান্টে আনা না গেলে সবই কেবল কথার কথা হয়ে যাবে।

প্রকৃতিবার্তাকে এই তরুণ উদ্ভাবক-উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এমন কিছু না আসুক যাতে মূল সমস্যাকে সমাধান না করে মানুষের চোখে ঠুলি পরিয়ে প্রতারণা করা যাবে। খেয়াল রাখা দরকার – দেশটা আমার, আপনার। প্রতারণা আমরা অপরের সাথে করছিনা। করছি নিজের সাথে।’

তবে সব দিক দিয়ে পলিথিনের বিকল্প খুঁজতে আবারও প্রকৃতিতে ফিরতে বলছেন সচেতনরা। সেই গ্রামবাংলার মাছ কেনার খালৈ কিংবা পাটের ব্যাগই বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির আদি ও পরীক্ষিত ভরসা।