উজ্জ্বল কমলা আর নীল রঙের অদ্ভুত সুন্দর পাখি ওরিয়েন্টাল ডোয়ার্ফ কিংফিশার বা উদয়ী বামন মাছরাঙা। দেশে প্রথমবারের মতো অতি দুর্লভ এই পাখিটির ভিডিওচিত্র ধারণ করেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন টিম। ধৈর্য আর অদম্য চেষ্টায় মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ক্ষুদে এই মাছরাঙার দেখা পায় দলটি। যা দেশের বন্যপ্রাণী গবেষণায় একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।
লাল ঠোঁট-গাঢ় লাল চোখ, কমলা-হলুদ পেট আর নীলচে-কালো পিঠ- প্রকৃতি যেন রূপকথার রং-তুলির আঁচড়ে নিখুঁতভাবে এঁকেছে ক্ষুদ্র পাখি উদয়ী বামন মাছরাঙাকে।
১৩ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের ছোট্ট এই পাখিটি অত্যন্ত নিভৃতচারী। পাহাড়ি, ছায়াঘন, নির্জন ও গহীন বনের ঝিরি বা জলধারার পাশেই বাস শিকারী এই পাখির।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে পাখিটির বিচরণ। তবে আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় অতি বিপন্ন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদে, রঙিন ও দুর্লভ এই মাছরাঙা।
চোখ ধাঁধানো সুন্দর এই পাখির খোঁজে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠি টিলার সংরক্ষিত গহীন বনে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের দল। দুর্গম বনের উঁচু-নিচু রাস্তা আর ঝোপ-ঝাড় জঙ্গলের শত বাঁধা পেরিয়ে অদম্য পথচলা।
দীর্ঘ পরিশ্রম আর ধৈর্য্যের যাত্রাপথে অবশেষে দেখা মেলে, বয়ে চলা ঝিরির পাশে দুর্লভ বামন মাছরাঙ্গার।
এই ভিডিওচিত্র শুধু পাখি প্রেমীদেরই নয়, জীববৈচিত্র্য গবেষকদেরও অনুপ্রাণিত করবে। জীববৈচিত্র্য গবেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মনিরুল এইচ খান বলেন, প্রকৃতি ও জীবন টিম এই মাছরাঙাটি খুঁজে পেয়ে আমাদের জীববৈচিত্রের তথ্যভাণ্ডারে বাড়তি তথ্য সংযোজন করেছে। কারণ আমরা এর আগে এই প্রজাতির মাছরাঙার স্থিরচিত্র দেখেছি, কিন্তু এবার ধারণ করা ভিডিওতে পাখিটিকে আরও নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ পাওয়া গেলো।
বামন মাছরাঙা সংরক্ষণের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পাখিকে সংরক্ষণের জন্য এদের যে আবাসস্থল অর্থাৎ আমাদের প্রাকৃতিক মিশ্র চিরসবুজ বন এবং এসব বনে প্রবাহিত ঝিরি-ছড়াগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। পাখিটির আবাস ও খাদ্য যোগানের স্থল যদি ঠিক থাকে, তাহলে প্রতি বছরই পাখিটি আমাদের দেশে আসবে।’
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের এই সাফল্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘ এই মাছরাঙাটা শীতে নয়, আমাদের দেশে আসে গ্রীষ্মের শেষ দিকে বর্ষায়। পরিযায়ী মাছরাঙাটি আসে দেশের বাইরে থেকে। তবে এসে লম্বা সময় আমাদের দেশে থাকে, সে হিসেবে বলা যায় এটি আমাদের দেশেরও।’
অনিন্দ্য সুন্দর পাখিটির ভিডিওচিত্র ধারণ করতে পেরে উচ্ছ্বসিত প্রকৃতিবন্ধু বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় এ ধরনের খুব আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। অনেক সময় দেখা যায় আগে কখনো যেধরনের প্রাণীর দেখা আমরা পাইনি সেধরনের প্রাণী হঠাৎ চলে আসে সামনে। এই বামন মাছরাঙাটাকেও আমরা সেভাবেই পেয়েছি। এখন এটা আগামীর জন্য একটা রেফারেন্স হয়ে গেল।’ যারা পরিযায়ী পাখি নিয়ে কাজ করে তাদের গবেষণাতেও বামন মাছরাঙার ভিডিও কাজে আসবে বলে আশা তাঁর।
বাংলার প্রকৃতিতে রহস্যময় ও নান্দনিক এই পাখির উপস্থিতি পাখিপ্রেমীদের আরও আগ্রহী করবে এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় আরও সচেতন করবে বলে প্রত্যাশা করে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন।
আফরোজা হাসি 




















