প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়। এই পাহাড়ি বনভ‚মিতে বসবাস করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তি¡ক জনগোষ্ঠী। তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনীয় রোগের চিকিৎসা বন থেকে পাওয়া উদ্ভিদ দিয়ে করে থাকেন। বনভূমি ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস, বন কেটে বসতি স্থাপন, শিল্পকারখানা নির্মাণ, বনভ‚মিতে অগ্নিসংযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানসহ বহুবিধ কারণে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। পাহাড়ি বনের জানা-অজানা প্রয়োজনীয় কয়েক প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়েই আজকের লেখা-
অনন্তমূল: অনন্তমূল বহুবর্ষজীবী, সরু, লতানো বীরুৎ বা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম: Hemidesmus indicus, GwU Asclepiadaceae পরিবারের উদ্ভিদ। মারমাদের কাছে তংনুবাং নামে পরিচিত। পাতা সরল, প্রতিমুখ, সরু ও লম্বা। পাতা সাধারণত ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ০.২৫ থেকে ১.২ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতার মাঝখানে শিরা বরাবর সাদা একটি দাগ থাকে। লতা বা পাতার যেকোনো অংশ ছিঁড়লে সাদা কষ বের হয়। মূলে এক ধরনের গন্ধ থাকে। অনন্তমূল ফুলের বাইরের দিক সবুজ এবং ভিতরের দিক বেগুনী। ফল ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা, জোড়ায় জোড়ায় জন্মে। বীজ চ্যাপ্টা এবং কালো। বর্ষাকালে ফুল এবং শীতের শুরুতে ফল দেখা যায়। cÖ¯ªv‡e R¡vjv‡cvov, RwÐm, Ak©‡ivM, AiæwP, wKWwb I পিত্তথলিতে পাথর হলে, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় অনন্তমূল ব্যবহৃত হয়। থানচি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ঔষধি বাগানে অনন্তমূল উদ্ভিদ রয়েছে। বীজ ও চারা সংগ্রহের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা যায়। বর্ষা মৌসুমের আগে বীজ বপন করতে হয়।

আয়াপানা: আয়াপানা বহুবর্ষজীবী বীরুৎজাতীয় লতানো উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম: Eupatorium triplinerve, Asteraceae পরিবারের উদ্ভিদ। মারমাদের কাছে পাইঞোবাং এবং চাকমাদের কাছে বৈসাক নামে পরিচিত। আয়াপানা ১ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা সরল, মসৃণ ও লম্বাকৃতির, তিন শিরাবিশিষ্ট, হালকা লাল। ডাঁটার পর্ব থেকে জোড়ায় জোড়ায় পাতা বের হয়। পাতায় অল্প অল্প লোম থাকে। আয়াপানের পাতার গোড়ার দিক থেকে সরু সরু শিকড় বের হয় এবং গাছের মাথায় ছোট ছোট বেগুনী রঙের ফুল হয়। জ্বর, পেটব্যথা, বাচ্চাদের ঠাণ্ডাজনিত অসুখ, পচা ঘায়ে ও রক্ত বন্ধ করতে এ উদ্ভিদের ব্যবহার রয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আয়াপানা পাওয়া যায়।

শ্যামালতা: শ্যামালতা বহুবর্ষজীবী, লতানো, গুল্মজাতীয় আরোহী উদ্ভিদ। বাংলায় এর অন্য নাম দুধিয়ালতা। মারমা ভাষায় তনহুবাং নামে পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম: Ichnocarpus frutescens, Apocynaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে Dark blue creeper নামে পরিচিত। শ্যামালতার পাতা খুবই শক্ত, বাকল লালচে-বাদামি, পশমাবৃত। পাতা সরল, প্রতিমুখ, বোঁটা খাটো। লতা ও পাতা ছিঁড়লে সাদা কষ বের হয়। ফুল ছোট, সবুজাভ সাদা বা ঈষৎ বেগুনী, গন্ধযুক্ত। ফল জোড়ায় জোড়ায় ধরে, সরু। বীজ কালো লম্বা হয়। বর্ষাকালে ফুল ও ফল দেখা যায়। বীজ বা কাটিংয়ের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করা যায়। দেশের সব জেলাতেই এই উদ্ভিদ পাওয়া যায়। শ্যামালতায় ভেষজগুণ রয়েছে। এর লতাপাতা, শিকড় ও কষ ব্যবহৃত হয়। প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ কম হলে শিকড় বেটে রস খেলে উপকার হয়। প্রস্রাব কম হলে বা হলুদ হলে শিকড় পাথরে ঘষে রস খেলে উপকার পাওয়া যায়। মূল বলকারক, শীতলকারক, রক্ত পরিষ্কারক ও প্র¯্রাবকারক। এই উদ্ভিদ জ্বর, চর্মরোগ, রক্তদৃষ্টি, রক্তপ্রদর, একজিমা, বাত, কীট-পতঙ্গের দংশনে ব্যবহৃত হয়।

গুইচ্চালতা: গুইচ্চালতা বহুবর্ষজীবী বা আরোহী বুনোগুল্ম। সাধাণরত ২ থেকে ৪ মিটার উঁচু হয়। মারমাদের কাছে এই উদ্ভিদ লমুন্যুইবাং নামে পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম: Calycopteris floribunda, Combretaceae পরিবারের উদ্ভিদ। গুইচ্চালতা সাধারণত ২ থেকে ৪ মিটার উঁচুু হয়ে থাকে। পাতা প্রতিমুখ, ৫ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল উভয়লিঙ্গিক। ফল পাখাযুক্ত। ফুল ও ফল জানুয়ারি-এপ্রিল মাসে দেখা যায়। ঘা, কুষ্ঠ রোগে ও ম্যালেরিয়া জ্বরে এবং ক্রিমিনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বৃহৎ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব জায়গাতেই প্রাকৃতিকভাবে গুইচ্চালতা জন্মে।

জটাশালপানি: জটাশালপানি বহুবর্ষজীবী, খাড়া, বাদামি, শাখাবিশিষ্ট গুল্ম। বৈজ্ঞানিক নাম: Desmodium pulchellum, Fabaceae পরিবারের উদ্ভিদ। মারমাদের কাছে এটি য়াংমমনা নামে পরিচিত। এই উদ্ভিদ সাধারণত ১ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। পাতা ত্রিপত্রকবিশিষ্ট, লম্বা, চামড়ার মতো, সবুজ এবং ওপরের পিঠ লোমশূন্য। মঞ্জরিপত্র বড়, প্রায় বৃত্তাকার, কিছুটা বাঁকা। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে জন্মে। শোথ রোগে, রক্তস্রাব ডায়রিয়ায়, বিষক্রিয়া দূর করতে ও চক্ষু রোগে ব্যবহৃত হয়।

বড় শালপানি: বড় শালপানি বহুবর্ষজীবী, খাড়াগুল্ম। বৈজ্ঞানিক নাম: Flemingia macrophylla, Fabaceae পরিবারের উদ্ভিদ। মারমাদের কাছে থামংছোবাং বা মংছোক নামে পরিচিত। সাধারণত ২ থেকে ৩ মিটার উঁচু হয়। পাতা সরল, করতলাকার ও ত্রিপত্রকযুক্ত। পাতা চামড়ার মতো, পাতলা। ফুল হালকা গোলাপি রঙের। বৃতি বেগুনী। পাপড়ি সাদা ও ফ্যাকাশে লাল রঙের মিশ্রণ। ফল লম্বা, চওড়া, স্ফীত, নরম মখমলের মতো। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ফুল এবং হেমন্ত ও শীতকালে ফল দেখা যায়। অজ্ঞান হলে, ফোঁড়া উঠলে, হাড় মচকে গেলে বা ভেঙে গেলে, কেটে গেলে, ফুলে গেলে, ডায়রিয়া হলে, মলদ্বারে ব্যথা হলে, প্রসবের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে এই উদ্ভিদের পাতা, বাকল ও শিকড় স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়।

চালমুগরা: চালমুগরা চিরসবুজ মাঝারি আকৃতির গাছ। ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম: Gynocardia odorata, Flacourtiaceae পরিবারের উদ্ভিদ। চাকমা স¤প্রদায়ের কাছে ভুলু মারমা সম্প্রদায় কাছে গ্রাংবাং বা বলগাছ নামে পরিচিত। গাছের বাকল ধূসর, কাঠ খুব শক্ত, ভিতরে সাদা হলেও বাইরের রঙ হলুদ। পাতা লম্বা, বর্শাফলকাকৃতির। স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে হয়। ফুল হালকা হলুদ রঙের। মার্চ-এপ্রিলে শক্ত গোলাকার কতবেলের মতো ফল হয়। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফল পাকে। পাকা ফল হলদে রঙের। ফলের গন্ধ মনমাতানো। ফলের মধ্যে অনেক বীজ থাকে। বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়। চালমুগরা বৃক্ষের আদিনিবাস বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনাঞ্চলে বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে এই গাছ দেখা যায়। বংশবৃদ্ধি হয় বীজের মাধ্যমে। চালমুগরা ভেষজ গুণ রয়েছে। রক্তার্শ সারাতে, খোস-পাঁচড়ার চিকিৎসায়, কুষ্ঠরোগে, মাথায় খুসকিতে চালমুগরার তেল ব্যবহৃত হয়।

কামদেব গাছ: কামদেব বড় আকারের চিরসবুজ গাছ। ১২ থেকে ৩০ মিটার উঁচু হয়। বৈজ্ঞানিক নাম: Calophyllum tomentosum, Calophyllaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে ‘Ôborneo mahogony’ নামে পরিচিত। পাতা সরল, সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা, পুরু ও আগা চোখা। পুস্পবিন্যাস কাক্ষিক, প্রতিটি মঞ্জরিতে ৮ থেকে ১০ টি ফুল থাকে। ফুল সাদা, বৃত্যাংশ চারটিÑ অসম, ডিম্বাকার থেকে অর্ধ গোলাকার। পুংকেশর অসংখ্য। ফল গোলাকার ও ঝুলন্ত। IUCN Red list ২০১১ সালে কামদেবকে বিপদাপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাভুক্ত। গাছটি সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন অঞ্চলের স্থানীয় গাছ। মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে তিনটি গাছ আছে। আদিনিবাস শ্রীলঙ্কা, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীন। কামদেব গাছের ব্যবহৃত অংশ বাকল, বীজ ও কাঠ। আলসার, সাপের কামড়, চোখের রোগে ব্যবহৃত হয়। কাঠ মাঝারি ভারি ও শক্ত, নির্মাণ কাজ, রেলের স্লিপার ও আসবাবপত্র তৈরিতে এর ব্যবহার রয়েছে। কাঠ নৌকার মাস্তুল, ইলেকট্রিক খুঁটি, সাঁকো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বীজের তেল চর্মরোগে ব্যবহৃত হয়।

কুকুরকট: কুকুরকট ১০ থেকে ১২ মিটার উঁচু গাছ। বৈজ্ঞানিক নাম: Hymenodictyon orixense, Rubiaceae পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলায় এর আরেক নাম কালাবুকনন। কাÐ সরল, গোলাকার, সুউচ্চ। শাখা-প্রশাখা বি¯ৃÍত। বাকল পুরু, ধূসর রঙের ও কাটাকাটা দাগ আছে। ভিতরের বাকল সাদা। এর বাকল তিতা। পত্রবিন্যাস বিপ্রতীপ, পশমের মতো নরম ও ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার চওড়া। ফুল ছোট, সবুজ আভাযুক্ত সাদা রঙের। একসঙ্গে অনেক ফুল ফোটে। ফল ডোরাকাটা, লম্বা ও মটর দানা থেকে দ্বিগুণ। ফলের ভিতরে ৬ থেকে ১২ টি বীজ থাকে। বর্ষাকালে ফুল ও ফল হয়। চাকমারা জ্বরনাশক ও বলকারক হিসেবে এটি ব্যবহার করে। কাঠ শক্ত এবং চায়ের বাক্স তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এলাকায় গাছটি দেখা যায়। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা কুকুরকট উদ্ভিদের আদিনিবাস। (চলবে)
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ
চয়ন বিকাশ ভদ্র 











