আসছে ২০২৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে অমর একুশে বইমেলা চিরায়ত আয়োজন। কিন্তু এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃহৎ পরিসরে স্টল বরাদ্দ পায়নি বাংলা একাডেমি। তাহলে আগামী মেলার আয়োজন কোথায় কীভাবে কেমন হবে সে প্রশ্নের উত্তর আদৌ মেলেনি। অথচ গত এক দশক ধরে বাংলা একাডেমি মূল চত্তর এবং বিশাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হচ্ছে বইমেলা। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ৬ নভেম্বর বাংলা একাডেমিকে চিঠি দিয়ে বলেছে যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবর্তে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই ‘অমর একুশে বইমেলা, ২০২৫’ আয়োজন করতে হবে। তবে একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, তারা আবারও চেষ্টা করবেন যেন বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই করা যায়।
১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মূল গেইটে চট বিছিয়ে প্রথম বই বিক্রি শুরু করেন চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনি প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা’র প্রতিষ্ঠাতা। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানমালার সাথে সঙ্গতি রেখে একাডেমির ভেতরে ছোট একটি স্টল স্থাপন করে মুক্তধারা। ১৯৭৭ সালে মুক্তধারার সঙ্গে আরও অনেকে যোগ দেয়। সেই থেকে আজকের ঐতিহাসিক একুশে বইমেলার সূচনা ঘটে। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী একাডেমিকে এই বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। এর পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা করা যায়নি। তবে পরের বছর থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সূচনা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

১৯৮৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নাম দিয়ে ধারাবাহিকভাবে মেলা পরিচালনা করছে। ২০২১ সাল থেকে মেলার প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। মেলা শুরু থেকেই একাডেমি প্রাঙ্গণে হয়ে এলেও ধীরে ধীরে পরিসর বাড়তে থাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আর জায়গা সংকুলান হয়নি। পরে একাডেমির সামনের সড়কেও বইমেলার স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তবে মেলার মূল মঞ্চ এবং তথ্যকেন্দ্র রাখা হয় একাডেমি প্রাঙ্গণেই।
এক দশক ধরে অমর একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমির পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে। মেলার বেশির ভাগ স্টলের বরাদ্দও হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলে বইমেলা আয়োজিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বর্গফুটের বেশি জায়গা নিয়ে। তবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল গত মেলার সময়ই। উদ্যান ঘিরে সাংস্কৃতিক বলয় তৈরির অংশ হিসেবে গত মার্চ মাস থেকে কিছু প্রকল্পের কাজ শুরুর পরিকল্পনা করেছিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সে কারণে ২০২৫ সালের বইমেলার জন্য তারা উদ্যানের জায়গা বরাদ্দ দেবে না বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়ে দিয়েছিল। বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সরিয়ে পূর্বাচলে নিয়ে যাওয়া হবে বলেও গুঞ্জন রটে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। গত ৬ নভেম্বরের চিঠিতে সে কথাই স্পষ্ট করা হয়েছে।
তাহলে আগামী মেলার আয়োজন কীভাবে হবে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম প্রকৃতিবার্তা ডটকমকে বলেন, “আমরা অবশ্যই চাইব বইমেলা যেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হয়। সেজন্য আমরা আবারও চেষ্টা করব।” বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রকৃতিবার্তা ডটকমকে বলেন, “আমি তো জানি না এরকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা। তবে সরকার যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা আয়োজনের অনুমতি না দেয়, তাহলে সবাই মিলে সরকারকে বোঝাতে হবে যে বইমেলা এখানে না হলে গুরুত্ব হারাবে। বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন করলেই ভালো। এটা লেখক, প্রকাশকসহ বইমেলা সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তারা সবাই মিলে সরকার বোঝালে আশা করি সিদ্ধান্ত পাল্টাবে।

উল্লেখ্য; সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকায় অবস্থিত একটি জাতীয় এবং সর্বজনীন স্থান। মূলত রমনা রেসকোর্স নামে পরিচিত। এটি দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির সাথে জড়িত থাকার কারণে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ঐতিহাসিক তাৎপর্যের স্বীকৃতিস্বরূপ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রাথমিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সম্মানে এলাকাটির নামকরণ করা হয়। স্থানটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘটনাকে নিবেদিত করার জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও কাচের দেয়াল কাঠামো রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বার্ষিক একুশে বইমেলার আয়োজন হয় যা দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বইমেলা। বই, কবি, সাহিত্যিক এবং পাঠকদের এই মিলন মেলা দেশের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির তীর্থভূমি হিসেবে বিবেচিত।
মাসুদুর রহমান 




















