আজ ১২ নভেম্বর, উপকূলবাসীর স্মৃতিতে এক ভয়াল দিন। ১৯৭০ সালের এ দিনে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। মূলত ভোলায় আঘাত হানা এই সামুদ্রিক ঝড় ‘দ্য গ্রেট ভোলা সাইক্লোন’ নামে পরিচিত। ভোলা ছাড়াও এই অঞ্চলের উপকূলীয় অন্যান্য এলাকাগুলোতেও সর্বশক্তিতে আঘাত হেনেছিল এক দানবীয় ঝড়। ভোলা সাইক্লোনে কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তখন।
জাতিসংঘের আওতাধীন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ২০১৭ সালের ১৮মে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। ভোলায় আঘাত হানা সাইক্লোনটিকেই ‘সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সবোর্চ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলীয় এলাকায় ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল।

সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে ওঠে উপকূলীবাসী । স্মরণকালের ভয়াবহতম ওই দুর্যোগে উপকূলীয় লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও বর্তমান কমলনগর উপজেলাতেও সৃষ্টি হয় চরম দুর্যোগময় পরিস্থিতির। লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল সব কিছু। মেঘনা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের প্রবল স্রোতের টানে ভাসিয়ে নিয়ে যায় হাজার হাজার মানুষ, গবাদি-পশু, ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্পদ। বিলীন হয়ে যায় দুই উপজেলার বেড়িবাঁধসহ অনেক জনপদ।
সেই ভয়ঙ্কর সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী নুরুল ইসলাম ভূলু ও আবুল খায়ের বলেন, হঠাৎ ১০ ফুটের একটি জলোচ্ছাস হয়। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম ভূলুর তিন আত্মীয়ের খোঁজ আর কখনোই মেলেনি। একই কথা বলেন, আবুল খায়েরও। তাদের চোখের সামনে দিয়ে স্বজনরা পানির তোড়ে ভেসে যায়। চারিদিকে লাশ-আর-লাশ, লাশের গন্ধে মানুষ কাছে যেতে পারেনি। জলোচ্ছাসের পানি আটকে থাকায় মাটি দেয়া যায়নি মৃত মানুষগুলোকে। নদীতে ভাসছিল হাজার হাজার মানুষ ও গবাদিপশু। সেই দিনের ভয়াবহ দুযোর্গের কথা মনে পড়লে আজও এলাকার সাধারণ মানুষের মন ভারী হয়ে ওঠে।

এখনো নিরাপত্তাহীন উপকূলের মানুষ। লক্ষ্মীপুরে মেঘনার উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়ণ কেন্দ্র এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেছে। যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এসব চরাঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানীসহ ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করছে স্থানীয়রা। রামগতির তলিরচর, বয়ারচর,বড়খেরী, চরআলগী ও কমলনগর উপজেলার চরফলকন, সাহেবেরহাট, চরকালকিনি, পাটওয়ারীহাট ও রায়পুরের চরঘাসিয়া ও চরকাচিয়া এবং সদর উপজেলার চরমেঘাসহ অন্তত ২০টি চরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে তিনলাখ মানুষের বসবাস।
কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সব সময় থাকতে হয় তাদের। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস ও যে কোন দুর্যোগের সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়। সেগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আর যেসব আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোর অবস্থা নাজুক। নেই দরজা-জানালা ও টয়লেট। এ জেলায় ১৮৫টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। অনেকগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আরো আশ্রয়কেন্দ্র ও মাটির কিল্লা করার দাবি উপকূলের ৭ লাখ মানুষের।
জেলা প্রশাসক রাজিব কুমার সরকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দূযোর্গপূর্ণ এলাকায় চিহিৃত করে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে বাচঁতে পর্যাপ্ত আশয়কেন্দ্র দরকার। আগামীতে সবাই যেন নিরাপদে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে। খুব শীঘ্রই আরো আশ্রয় কেন্দ্র ও মাটির কিল্লা নির্মাণ কাজ শুরু করার আশ্বাস দেন তিনি।
ডেস্ক রিপোর্ট 




















