সীমাহীন লোভে পরিবেশ ধ্বংসের পরিণতি দেশজুড়ে দেখা দিচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসের নানা ক্ষয়-ক্ষতির প্রতিবেদন। এমনকি যাদের পরিবেশ রক্ষার কথা তারাও বাদ যাচ্ছে পরিবেশ ধ্বংস করা থেকে। এরকমই একটি বাস্তবচিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সমকাল অনলাইন।
সমকাল প্রতিবেদক জাহিদূর রহমানের কথা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: রাজধানীর কাছাকাছি অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বনভূমি ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’। এটি শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, আশপাশের মানুষের জন্য নির্মল বাতাসের উৎসও। সংরক্ষিত এই বনভূমির ভেতরেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বর্জ্যের ভাগাড় বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে এই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে এখনও মুখোমুখি অবস্থানে সিটি করপোরেশন ও বন বিভাগ। এই কারণে কাটছে না জটিলতাও।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গাজীপুরের মাস্টারবাড়ি পার হলেই শালবনের শুরু। সারি সারি শালগাছের মধ্যে এক ধরনের নীরবতা থাকে। মাঝেমধ্যে দেখা মেলে বানরের দল, শোনা যায় পাখির ডাক। তবে জাতীয় উদ্যানের মূল প্রবেশপথের একটু আগে সেই নীরবতা ভেঙে দিয়েছে যন্ত্রের শব্দ। খননযন্ত্র চলছে, শ্রমিকরা মাটি কাটছে, তৈরি হচ্ছে নতুন রাস্তা আর টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর।
বন বিভাগ বলছে, এই নির্মাণকাজ শুরু হয় গত ১১ এপ্রিল। ওই দিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ শ্রমিকদের শেড নির্মাণের কাজ শুরু করলে বন কর্মকর্তারা বাধা দেন। পরদিন সেটি অপসারণ করা হয়। তবে ১৩ এপ্রিল পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে জড়ো হয় প্রায় ২০০ লোক। এরপর ভেকু দিয়ে জাতীয় উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বালু-মাটি ভরাট শুরু হয়। একই সঙ্গে পুনরায় শেড নির্মাণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে আগুন জ্বালানো এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের মতো কর্মকাণ্ডও হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে তারা কাজ বন্ধে রাজি হননি। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে বন বিভাগ ১৫ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় উদ্যানের কোর জোনের ভেতরে লেবার শেড নির্মাণ ও ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের কাজ চলছে, যা সরাসরি আইনবিরোধী। সহকারী বন সংরক্ষক, রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং অন্য কর্মকর্তারা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে প্রশাসক জানান, এই প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ছাড়া এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের এক যুগ্ম সচিবের সঙ্গে আলোচনায় বন কর্মকর্তারা আইনগত বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, আইন জানার প্রয়োজন নেই; প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া কাজ বন্ধ হবে না।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা এই অবস্থানকে আইনের সুস্পষ্ট অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ না করে উল্টো বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষিত জাতীয় উদ্যান থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত কোর জোন। অভয়ারণ্যে ক্ষতিকর পদার্থ ডাম্পিং ও কোনো প্রকার অগ্নিসংযোগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। জাতীয় উদ্যানটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, বর্জ্য ফেলা বন্ধে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বৈঠক করে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তবে গায়ের জোরে সংরক্ষিত বনের ভেতরে প্রবেশ করে দেয়াল ভেঙে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
এই চিঠি চালাচালির মধ্যেই গত মঙ্গলবার রাতে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মূল ফটকের সামনে রাতের আঁধারে বর্জ্য ফেলা হয়। মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চাকায় লেগে ময়লা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গতকাল দুপুরে সেই বর্জ্য তুলে নিয়ে যায় সিটি করপোরেশন।
সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ভাড়া নিয়ে এই কাজ করছেন। জমিটি বনের নয় এবং সেখানে এমনভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হবে যাতে বনের কোনো ক্ষতি না হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এখানে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। এমনকি বনের ভেতরে ব্যক্তিগত জমি হলেও সেখানে এই ধরনের স্থাপনা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। গতকাল এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের কোর জোনে বর্জ্য ডাম্পিং ও স্থাপনা নির্মাণ আইনবিরোধী এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য ফেলা হলে তা বায়ু ও মাটিদূষণ বাড়াবে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করবে এবং রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটাতে পারে।
বন বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানে বর্জ্য ফেলা শুরু হলে তা বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বানর, শিয়াল, বেজি, শূকরের মতো প্রাণী বর্জ্য খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে রোগজীবাণু মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গিয়ে গাছপালার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন বলেন, বনের ভেতরে বর্জ্য ফেললে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। এতে মাটি, পানি, বায়ুসহ সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পনগরীগুলোতে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তবে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে সংরক্ষিত বনভূমিকে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা ভাওয়ালের মতো বনভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















