নিয়মিত হাত ধোয়া আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি সহজ অভ্যাস হলেও এর উপকারিতা অনেক। যেকোনো টিকার চেয়েও মোক্ষম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হল হাত ধোয়া। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উদরাময় এবং শ্বাসনালির প্রদাহের মতো রোগগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান দুটি কারণ। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে উদরাময় অর্ধেক এবং শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ এক-তৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, (WHO) নির্দিষ্ট কিছু কাজের আগে এবং পরে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়। নিয়মিত হাত ধোয়া খুব জরুরি, কারণ আমাদের হাত প্রতিদিন নানা জিনিসের সংস্পর্শে আসে এবং সহজেই জীবাণু বহন করতে পারে। হাত না ধুলে সেই জীবাণুগুলো শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
জীবাণু কোথায় থাকে?
জীবাণুর রাজত্ব সর্বত্র। ঘরের ভেতরে, বাইরে, ধুলাবালিতে–সব জায়গায় জীবাণু লুকিয়ে আছে। এমনকি আপনার মানিব্যাগের টাকার ভেতরেও কিলবিল করছে অসংখ্য জীবাণু। একমুঠো মাটিতে সারা বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। ভাবুন, এই জীবাণুভরা হাত যখন মুখে দেন, তখন তা কতটা ভয়ংকর হতে পারে!
হাত থেকে ছড়ায় যেসব রোগ
সাধারণ সর্দি, ফ্লু, উদরাময় থেকে শুরু করে পেটের ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়া যেমন–সালমোনেলা ও ই-কলাই, সবই হাতের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়াও, হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-ই, চামড়ার প্রদাহ, ট্রাকোমা-এর মতো চোখের রোগ এবং মেনিনজাইটিসের মতো ভয়ানক রোগ ছড়ানোর পেছনেও হাতের ভূমিকা রয়েছে। সোয়াইন ফ্লু, কভিড-১৯ বা ইবোলার মতো আতঙ্ক ছড়ানো ভাইরাসগুলোও হাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা থেকে নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কখন হাত ধোবেন?
হাত ধোয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। এটি একটি নিয়মিত অভ্যাস। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক। যেমন, খাবার খাওয়ার আগে ও পরে। খাদ্য গ্রহণের আগে অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে। শৌচাগার ব্যবহারের পর আপনার হাতে জীবাণুরা বাসা বাঁধে। সে জন্য ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা জরুরি। বাচ্চাদের ডায়াপার বদলানোর পর হাত পরিষ্কার করতে হবে। গৃহপালিত পশুপাখি বা অন্য কোনো প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর হাত ধোয়া উচিত। হাঁচি বা কাশির সময় হাত দিয়ে মুখ ঢাকার পর হাত পরিষ্কার করা জরুরি। খাবার তৈরির আগে এবং বিশেষ করে মাছ-মাংস রান্নার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
কীভাবে প্রবেশ করে জীবাণু?
জীবাণু শুধু খাবারের মাধ্যমেই প্রবেশ করে না। আমরা প্রায়ই অজান্তে হাত দিয়ে চোখ ও নাক স্পর্শ করি। এভাবে হাতের জীবাণু খুব সহজে আমাদের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ, কারণ তারা নোংরা হাত মুখে তো দেয়ই, শরীরের অন্যান্য গুপ্ত অঙ্গেও হাত দেয়। এভাবে বাইরের জীবাণু খুব সহজেই দেহের ভেতরে প্রবেশ করে আমাদের অসুস্থ করে তোলে।
হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি
শুধু পানি দিয়ে হাত ভেজানোকেই হাত ধোয়া বলে না। সঠিকভাবে হাত ধোয়ার জন্য এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
হাতে সাবান মেখে নিন। হাতের তালু, আঙুলের ফাঁক, নখ এবং কব্জি পর্যন্ত ভালোভাবে ২০ সেকেন্ড ধরে ঘষুন। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে সাবান ধুয়ে ফেলুন। পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত শুকিয়ে নিন।
ছোটবেলা থেকেই হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ুন
হাত ধোয়ার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা উচিত। মা-বাবা এবং পরিবারের বড়রাই পারেন শিশুদের মধ্যে এই সুন্দর অভ্যাসটি তৈরি করতে। সবাই মিলে যদি এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলি, তাহলে জীবাণুর সহজ শিকার হওয়া থেকে আমরা বাঁচতে পারব। চলুন, আজই শুরু করি এই সহজ কাজটি এবং জীবাণুকে বোল্ডআউট করি।
হাত ধোয়া শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার একটি উপায় নয়, এটি রোগ প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য এই অভ্যাসটি আমাদের সবারই মেনে চলা উচিত। তাই বিশেষ করে খাবার খাওয়ার আগে, রান্না করার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, হাঁচি-কাশির পর এবং বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হাত ভালোভাবে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ডেস্ক রিপোর্ট 
























